পঁচিশে বৈশাখ, চির-নূতনেরে দিল ডাক
এসএম মুন্না
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ০৮:০৯ এএম, ৮ মে ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৭:০১ পিএম, ৮ মে ২০১৮ মঙ্গলবার
রাত্রি হলো ভোর।/আজি মোর/জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/হাতে করে আনি/দ্বারে আসি দিল ডাক/...উদয় দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।/মোর চিত্ত-মাঝে/চির-নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।
আজ পঁচিশে বৈশাখ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭তম জন্মদিন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি সাধনে তার ৮০ বছরের অমূল্য জীবনসাধনার তুলনা শুধু তিনিই। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের মতো গৌরবময় স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের আসনে আসীন করেছেন তিনি।
আধুনিক বাঙালির রুচি ও মানস গঠিত হয়েছে তার হাতেই। তার লেখা, দর্শন, চিন্তা-চেতনার বহুমাত্রিক আলোকছটার ঔজ্জ্বল্য ও মহিমায় বাঙালির জাতিসত্তা মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত।
আজ মঙ্গলবার সারাদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে পালন করা হবে রবীন্দ্র জন্মদিন। এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কী আনন্দ বা বেদনায়, কী গৌরব বা ক্ষোভে-ক্রোধে, প্রেমে-মমতায়_ বাঙালির প্রতিটি আবেগ আর সূক্ষ্ম অনুভূতিকে স্পর্শ করে আছেন রবীন্দ্রনাথ। বাঙালিকে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের ভাষা দিয়েছেন তিনি। দেখার দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছেন; দিয়েছেন সৃষ্টির প্রেরণা। বাঙালির শিক্ষা, নান্দনিক বোধ, সাংস্কৃতিক চর্চা, দৈনন্দিন আবেগ-অনুভূতিতেও সারাক্ষণ জড়িয়ে আছেন তিনি। আছেন নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে, বুদ্ধি-বোধ-মর্ম-কর্মে। তাকে পাওয়া যায় প্রেম-ভালোবাসা, প্রতিবাদ, আন্দোলনের অঙ্গীকার এবং স্রষ্টার আরাধনার নিবিষ্টতায়। বাঙালির গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধেও পাওয়া যায় তাকে আত্মশক্তিরূপে। তার অমর সৃষ্টি ‘আমার সোনার বাংলা’ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত।
কৈশোর পেরোনোর আগেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত বদলে দিতে শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধ হতে থাকে বাঙালির শিল্প-সাহিত্য। বাংলা কবিতার আধুনিকতার নবায়ন ঘটেছে তার হাতেই। বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথই। বাংলা গদ্য সমৃদ্ধির নতুন সোপান খুঁজে পেয়েছে এই মহৎ প্রতিভার হাতেই। প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন।
সাহিত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সঙ্গীতভাণ্ডারকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণী ও সুরের ইন্দ্রজাল গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
মানবতাবাদী এ কবি মানুষের ওপর দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল ছিলেন। তার মতে, মানুষই পারে অসুরের উন্মত্ততাকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে সুরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘নাইট’ উপাধি দেয়; কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ওই উপাধি বর্জন করেন রবীন্দ্রনাথ।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী
বিশ্বকবির ১৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আলাদা আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিময় পৃথিবী গড়াই হোক ‘আমাদের প্রত্যয়’- এ রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন ‘রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও মননের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছেন। বাঙালির সুখ-দুঃখ, আবেগ-ভালোবাসা, আশা-আকাঙ্খাসহ এমন কোনো অনুভূতি নেই যা রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করেননি।’ তিনি বলেন ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের একজন দিকপাল, উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কালজয়ী লেখায় একদিকে ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, অন্যদিকে তা বিশ্বসাহিত্যের অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে আপন বৈভব, আঙ্গিক, বহুমাত্রিকতা আর সর্বজনীনতায়। বিরল প্রতিভার অধিকারী এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কেবল আমাদের সৃজন-মনীষার প্রতীকে পরিণত হননি, তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিশ্বের সব মানুষের কাছে আদৃত হয়েছে। তাঁর প্রজ্ঞা, দর্শন, সৃষ্টিশীলতা, উদার মনোভাব ও মানবতাবোধ বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত।’
‘
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণী বলেছেন, ‘বিশশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের উজ্জ্বল বাতিঘর। বাংলা ও বাঙালির অহংকার, বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) বিস্তৃত করেছেন বাংলা সাহিত্যের পরিসর।’ তিনি আরও বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সাহিত্য, সংগীত ও শিল্প চর্চার মাধ্যমের প্রতিটি শাখায় তাঁর অনন্য ও অনায়াস বিচরণ সত্যিই বিস্ময়কর। বিশ্বকবির সমস্ত সৃষ্টির মূলে নিহিত মানবতাবাদ তাঁকে বিশিষ্টতা দান করেছে। শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের সাধক।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান মুক্তিকামী বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘জীবনের প্রতিটি সমস্যার-সংকট, আনন্দ-বেদনা এবং আশা-নিরাশার সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রসৃষ্টি আমাদের চেতনাকে আন্দোলিত করে, এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়। আমাদের চিন্তা, বোধ ও অনুভূতিতে তিনি (বিশ্বকবি) আমাদের হৃদয়ের কাছের মানুষ।’
কর্মসূচি
দিবসটি উপযাপনের লক্ষ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকে কাল দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণ ডিহি-পিঠাভোগে উদযাপিত হচ্ছে সরকারি আয়োজনে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানীতেও সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করবে। দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ নিবন্ধ। সরকারি-বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
রবীন্দ্রজয়ন্তীর সরকারি মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল আবদুল মুহিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী।
শিল্পকলা একাডেমি কবিগুরুর পূর্ববঙ্গ থাকাকালীন সময়ে রচনা নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। বিকেল তিনটায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে থাকছে রবীন্দ্র মেলা। ছায়ানটে রয়েছে দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। বাংলা একাডেমি এরইমধ্যে প্রদান করছে রবীন্দ্র পদক ও আয়োজন করছে আলোচনা সভার। এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে স্মরণ করবে কবিগুরুকে।
