ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৫:২৭:৫৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

গল্প # অহংকারি মোরগ # আইরীন নিয়াজী মান্না

প্রকাশিত : ০৬:১৩ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৬:১৩ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার

লাল ঝুটিওয়ালা মোরগটা বললো : আজ আমি সামনের ওই জলাশয়টা পেড়িয়ে দূরের গ্রামে যাবো। মুরগিটা বেশ অবাক হয়ে বললো : কেনো? মোরগটা বললো : খাবারের সন্ধানে। মুরগিটা বললো : অচেনা জায়গা, অপরিচিত লোক! তোমাকে ধরে ফেলবে। আর ফিরতে পারবে না। মোরগটা দম্ভভরা কণ্ঠে বললো : তোর সব বাজে কথা। আমাকে কেউ ধরতে পারবে না। মুরগিটা বললো : তুমি পথ হারিয়ে ফেলবে। মোরগটা বললো : নাহ্। আমি ঠিক সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবো। একই জায়গায় থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুচকে এক গ্রাম। আর একই খাবার খেতে খেতে আমার মুখ তেতো হয়ে গেছে। তোর ওই একই মুখ দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত। মুরগি ওর কথা শুনে হাসলো। বললো : তুমি পাগল হয়ে গেছো। আমাদের গ্রামটা কত সুন্দর! আর লোকজনগুলোও কত ভালো। সবাই আমাদের চেনে। কোনো বিপদ নেই। আমরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াই সারা দিন। তুমি ওসব কি বলছো! অবাক হয় মুরগি। মোরগটা বললো : তোর সব সেকেলে কথাবার্তা শুনতে আমার ভালো লাগে না। আমার রূপ দেখেছিস। পুকুরের জলে তাকিয়ে দেখ তোর চেহারা। আমি তোর চেয়ে কত সুন্দর! মুরগিটা এবার হাসতে হাসতে বললো : দেখেছি, দেখেছি। তোমার রূপ যেমন সুন্দর, মনটা ঠিক তার উল্টো। এত অহংকার করো না। জ্ঞানিরা বলেন অহংকার পতনের মূল। কথাগুলো শেষ করেই মুরগিটা ঘাসের নিচে খাবারের সন্ধান করতে লাগলো। ওর কথা শুনে মোরগটা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। ওর দিকে তেড়ে এসে বজ্রকণ্ঠে বললো : ওরে পুচকে মুরগি সারাদিন তো আমার পেছনে পেছনে ঘুরিস। আমি না থাকলে অন্য মোরগ-মুরগিগুলো তোকে কবেই মেরে ফেলতো ঠুকরে ঠুকরে। সে কথা ভুলে গেছিস? মুরগিটা কিছুই বললো না। নিরাপদ দূরে দাড়িয়ে খাবারের সন্ধান করতে লাগলো আপন মনে। মোরগটা আবারও বললো : আমার লাল টুকটুকে ঝুটি; রঙ ঝলমলে লেজ আর আলো ঝলকানো গলা। কি সুন্দর আমি! আমার এই রূপ আমি অন্য গাঁয়ের মুরগিদের দেখাবো না? কথা শেষ করেই সে পুকুরের জলে নিজের ছায়া দেখতে লাগলো। ওরা অনেকক্ষণ কোনো কথা বললো না। অনেক পরে মুরগিটা বললো : তুমি কি সত্যি যাবে দূরের পথে? যদি গেরস্থ জানতে পারে? মোরগটা এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো : হ্যাঁ আমি এক্ষুনি যাবো। কেউ কিছুই জানতে পারবে না। আমি চললাম। কথা শেষ করেই মোরগটা জলাশয়ের দিকে হাটতে শুরু করলো। মুরগিটা আতঙ্কিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললো : তুমি ভুল করছো। সামনে তোমার বিপদ। ফিরে এসো। মোরগটা মুখ ঘুরিয়ে চাপা গলায় বললো : তোকে ওসব কিছুই ভাবতে হবে না। তুই চুপ থাক। তারপর সে তরতর করে হেটে চলে গেলো জলাশয়টার কিনারে। মুরগিটা ভয় ভয় চোখে তাকিয়ে রইলো মোরগটার চলে যাওয়া পথের দিকে। মুরগিটা পেছন থেকে আবারও বললো : তোমার বড় রকম বিপদ হয়ে যাবে। তোমাকে ধরে ফেলবে লোকজন। তুমি জানো না অচেনা লোকজন খুবই দুষ্টু। তুমি আর ফিরতে পারবে না। মোরগটা পেছন দিকে না তাকিয়েই বললো : তুই ঘরে ফিরে যা। আমি সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবো। মাগরিবের আজানের আগেই এই জলাশয়ের পাশে দাড়িয়ে ডেকে উঠবো। আমার ডাক শুনে সবাই নামাজ পড়তে যাবে। জলাশয়টায় জল ছিলো খুবই কম। তার ওপর বড় বড় কচুরিপানা ভাসছিলো। সেই কচুরিপানার ওপর দিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দে ওপারে চলে গেলো মোরগটা। মুরগিটা অসহায়ের মত শুধু তাকিয়ে রইলো অহংকারি মোরগটার দিকে। ওপারে পৌঁছেই মোরগাটা বড় বড় পাখা নেড়ে গা ঝারা দিলো। মুরগিটার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হেসে উঠলো। তারপর চারদিক কাঁপিয়ে ডেকে উঠলো ভরাটকণ্ঠে কুক কু কু। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই জলাশয়টাকে পেছনে ফেলে হাটতে শুরু করলো সামনের পথে। মুরগিটা তাকিয়েই রইলো মোরগটার চলে যাওয়া পথের দিকে। অনেকক্ষণ পর মোরগটাকে আর দেখা গেলো না। সে মিলিয়ে গেলো অজানার পথে। মুরগিটার বুকের ভেতরটা কেমন মোচর দিয়ে উঠলো অজানা আতঙ্কে। দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো বুকের ভেতর থেকে। ও মনে মনে বলে উঠলো : ওহে অহংকারি মোরগ তোর ওই রূপই তোকে একদিন ডোবাবে। তোর রূপে মুগ্ধ হয়ে অচেনা লোকে তোকে ধরে নিয়ে যাবে। অথচ তুই তা বুঝলি না। মুরগিটা সারাদিন একা একা ঘুরতে লাগলো। ওর মনের ভেতরটা কেমন খচখচ করতে লাগলো সারাক্ষণ। ভাবলো এই হয়তো ফিরে এলো মোরগটা। এক্ষুনি হয়তো ফিরে এসে পেছন থেকে বলবে : তুই ঠিকই বলেছিস। দূরের পথে অনেক বিপদ। তোর কথা শুনেই আর গেলাম না। ফিরে এলাম। কিন্তু সন্ধ্যানাগাদ মোরগটা সত্যিই ফিরে এলো না। শেষ বিকেল থেকে মুরগিটা জলাশয়ের পাশেই দাড়িয়ে রইলো ওর ফিরে আসার অপেক্ষায়। দূরে একটা মোরগ ডেকে উঠলো বটে। কিন্তু সে শব্দ শোনা গেলে ক্ষীণ। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান পরলো। নামাজিরা পা বাড়লো মসজিদের পথে। কিন্তু মোরগটা আর এলো না। ভগ্নহৃদয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার গায়ে মেখে মুরগিটা একাই বাড়ি ফিরলো। গেরস্থ বাড়িতে এবার খোঁজ পরলো মোরগটার। সারা গাঁ তন্যতন্য করে খুঁজেও গেরস্থ সন্ধ্যান পেলো না মোরগটার। সে জানতেও পারলো না মোরগটা জলাশয় পেড়িয়ে চলে গেছে অচেনার পথে। সত্যি মোরগটা আর ফিরে এলো না এই গাঁয়ে; এই গেরস্থ বাড়িতে। মুরগিটা এখন একা একাই ঘুরে বেড়ায় গাঁয়ের পথে। আর ঠিক সন্ধ্যার আগে গিয়ে দাড়িয়ে থাকে ওই জলাশয়ের কিনারে। যদি কোনো দিন ফিরে আসে অহংকারি মোরগটা...। ১১.১১.১৪ cok_01cok_03cok_04