ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১৫:২৭:৫৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

খাদ্যদ্রব্যের প্রচন্ড দাম : পুষ্টিহীনতায় নিম্নবিত্ত শিশুরা

প্রকাশিত : ০৬:৩৬ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৪ রবিবার | আপডেট: ০৬:৩৬ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৪ রবিবার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : খাদ্যদ্রব্যের লাগামহীন গতির কারণে দেশের নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর দিশেহারা অবস্থা৷ দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় মিলছে না পুষ্টিকর খাবারসহ অনেক প্রয়োজনীয় খাদ্য৷ ফলে এর প্রভার পড়ছে পরিবারের শিশুদের উপর৷ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে তারা৷ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রকম রোগ-ব্যধিতে৷ রাজধানীর বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবক, পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিত্‍সকের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে৷রাজধানীর ১০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০০জন ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাদের দৈনন্দিন খাবাবের তালিকার এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে৷ এই ছেলে মেয়েদের মধ্যে ৫০ জন ছাত্র এবং ৫০ জন ছাত্রী৷ এদের বয়স ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এবং এরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান৷ তাদের অভিভাবকের মাসিক আয় ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা৷ তাদের কারো বাবা পান বিক্রেতা, কারো বাবা রিক্সা মেকার, কেউ আবার রাজমিস্ত্রির কাজ করেন৷ এদের অধিকাংশেরই মা কিছু করেন না৷ ১০ শতাংশ শিশুর মা আয়া, বুয়া বা বাসা-বাড়িতে ঝি এবং গার্মেন্টসে কাজ করেন৷ শতকরা ৮৫ জনের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জনের বেশি৷ সরজমিনে রাজধানীর দশটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে এসব ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের অধিকাংশই দিনে তিন বেলা মোটা চালের ভাত খায়৷ তবে তরকারি হিসেবে তারা সামান্য শাক ও খেশারি বা আলুর ডাল এবং কখনো কখনো এক টুকরা মাছ পেয়ে থাকে৷ সকালের নাস্তা হিসেবে অধিকাংশই পান্তাভাত ও আগের রাতের উচ্ছিষ্ট তরকারি খেয়ে থাকে৷জানা গেছে এই সব শিশুদের মধ্যে ৭০ জনই গত তিন মাস কোনো রকম মাংস খায়নি৷ প্রায় ৯৫ জন গত ছয় মাস ধরে ডিম খায়নি এবং শতকারা একশ জনই এ সময়ে দুধ খেতে পায়নি৷ অধিকাংশ শিশুই জানিয়েছে দুপুরে তারা লাল শাক, পুঁই শাক বা অন্য কোনো শাক এবং ছোট মাছ খেয়ে থাকে৷ রাতের খাবারে বরাদ্দ থাকে আলু ভর্তা৷ ডালের দাম বৃদ্ধির কারণে অধিকাংশই ডাল খেতে পারে না বলে জানিয়েছে৷ গত এক বছরের উচ্চ মূল্যের কারণে রুই, কাতলা, ইলিশ বা এই ধরণের বড় মাছ এই শিশুদের শতকরা ৯০ জন খেতে পারেনি৷ তিনবেলা খাবারের বাইরে এদের অধিকাংশই অন্য কোনো খাবার গ্রহণ করে না৷ তাদের অনেকেই ২/১ বার মৌসুমি ফল আম খাওয়া ছাড়া অন্য কোন ফলমূল খেতে পায় না৷ তবে কেউ কেউ বাড়িতে মাঝে মাঝে কলা খেয়ে থাকে৷ এদিকে পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রতিদিন একটি শিশুর শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী আমিষ, স্নেহ, শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজন৷ ডিম, দুধ ও ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন অন্তত সপ্তাহে একদিন৷ তারা জানান, ১০ থেকে ১৫ ভাগ ক্যালরী আসে আমিষযুক্ত খাবার থেকে, ১৫ থেকে ২০ ভাগ ক্যালরী আসে চর্বিযুক্ত খাবার থেকে এবং শারীরীক চাহিদা মেটাতে বাকী ক্যালরী আসে কার্বহাইড্রেড বা শর্করা থেকে৷ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, য়েছেন এসব প্রয়োজনীয় খাদ্যউপাদানের ঘাটতির কারণে নিম্নবিত্ত পরিবারে শিশুদের স্বাভাবিক ও সুঠাম দেহ গঠন হচ্ছে না৷ গড় উচ্চতা কমে যাচ্ছে৷ মেধা বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে৷ ঠিকমতো মানসিক বৃদ্ধিও হচ্ছে না৷ এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনষ্টিটিউটের পুষ্টি বিজ্ঞানী অধ্যাপক বদরুন নাহার জানান, সাধারণত ভাত থেকে সবচেয়ে বেশি আমিষ পাওয়া যায়৷ ভাতের সঙ্গে অন্যান্য খাদ্য গ্রহণের ফলে শর্করা, ম্নেহ, ভিটামিন, মিনারেল ও পানিসহ অন্য সব পুষ্টি উপাদানগুলো শরীরে প্রবেশ করে খাদ্য উপাদানের চাহিদা মেটায়৷ তার মতে নিম্নাবত্ত পরিবারের শিশুরা দুইবেলা ঠিক মতো ভাত খেতে পারছে না৷ অন্যান্য খাবারও দেহের চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছে না৷ ফলে প্রয়োজনীয় শক্তিদায়ক খাদ্যের অভাবে তাদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা দেখা দিচ্ছে৷ এর কারণে প্রথমত এই শিশুরা স্বাভাবিক উচ্চতায় বেড়ে উঠছে না৷ দিনে দিনে ওদের গড় উচ্চতা কমে যাচ্ছে৷ তিনি বলেন, ‘এই সমস্যাটা এখনই আমরা বুঝতে বা ধরতে পারছি না৷ কিন্তু আজকের এই খাদ্যস্বল্পতার কারণে আমাদের একটি প্রজন্ম কম উচ্চতার ও ক্ষর্বাকৃতির হয়ে বড় হচ্ছে৷ এটা আমাদের ভবিষ্যত্‍ প্রজন্মের জন্য সুখকর কিছু নয়৷’ এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম সারোয়ার জানান, শক্তিদায়ক খাবারের অভাবে এসব শিশুরা ক্রমশ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে৷ প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে তাদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশ হচ্ছে না৷ তারা রক্তশূন্যতা, দৃষ্টিহীনতা, বেরিবেরি, স্কার্ভিসহ অনেক জটিল রোগে ভুগছে৷ তাদের স্বাভাবিক শারীরিক গঠন হচ্ছে না৷ এরা শারীরিকভাবে দূর্বল, ক্ষর্বাকৃতি ও জীর্ণ হয়ে পরছে৷ পর্যাপ্ত আদর্শ খাবারের অভাবে এসব শিশুদের মানসিক বিকাশও চরমভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে৷ ডা. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘টোটাল ফুড বা সম্পূর্ণ খাদ্য না খাওয়ার কারণে এদের মধ্যে নানা রকম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে৷ যে কোনো রোগই এদেরকে দ্রুত আক্রমণ করতে পারছে৷ এসব শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে৷’ এদিকে অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিনিয়ত সীমাহীনভাবে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও সন্তানদের মুখে প্রয়োজনীয় ভালো খাবারটি তুলে দিতে পারছেন না তারা৷ তারা অভিযোগ করে বলছেন, আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সংসার চালাতে তাদেরকে হিমশিম খেতে হচ্ছে৷ এই অবস্থায় সন্তানের জন্য ডিম, দুধ কিংবা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার কেনা চরম কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে৷ এ প্রসঙ্গে রাজধানীর একটি বেসরকারী স্কুলের আয়া শামসুন নাহার বলেন, ‘আজকের দিনে পাঁচ সন্তান ও স্বামী নিয়ে ঢাকার বুকে বাসা ভাড়া করে কিভাবে যে আছি তা আর বলে বোঝানো যাবে না৷ আমার স্বামী মুদি দোকানের কর্মচারি৷ দুইজনে আয় করেও দুই বেলা দুই মুঠো খাবার যোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে৷’ তিনি আরও বলেন, ‘২৮ টাকা কেজি চাল কিনতে হয় ভোর রাত থেকে লাইনে দাড়িয়ে৷ তাও নিয়মিত পাওয়া যায় না৷ বাচ্চাদের মোটা ভাত, আলু ভর্তা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি না৷ মাছ মাংস বা ফল কেনার জন্য বাড়তি টাকা কোথায় পাবো?’ ১৭.১১.২০১৪