দংষিত বিবেক
প্রকাশিত : ০৬:৫৬ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৪ রবিবার | আপডেট: ০৬:৫৬ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০১৪ রবিবার
আফরিন জাহান :
ঘটনা-১ : প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেই হবে বাকিটা তারা দেখবেন। এতে করে নড়েচড়ে বসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্য্ন্ত। কিন্তু এটা কি নতুন কোন ঘটনা? হয়তো এইচ টি ইমাম বলেছেন বলে বিষয়টি নিয়ে এত সাড়া পড়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এতদিন কি এগুলো ছিল না? অবশ্যই ছিল তবে অব্যক্ত। যুগে যুগে আমাদের দেশে সাধারণদের বেলায় এমনটাই ঘটছে।
আমার পরিচেত এক ছাত্রলীগ কর্মী আমাকে বলছিলেন, ‘জান ছাত্রলীগ করাটা আমার জন্য ছিল আশির্বাদ।’ এটা সে না বললেও আমি জানতাম শুধু মাত্র এর জন্যই জীনটা তার উৎরে গেছে।না চাইতেই অনেক কিছূ চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। তবে শুধুমাত্র ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্র রাজনীতি করলেই যে উৎরে যাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়। উৎতে যেতে হলে আবার কখনো কখনো স্বজনপ্রীতিও কাজ করে। এই যেমন কিছুদিন আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনিক্যাল ক্যাডারে পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে এক মোল্লা গোছের পরীক্ষার্থী বলল,‘চাকরীটা আমার হবেই। জানতে চাইলাম কিভাবে এত নিশ্চিত হলেন? তিনি তরিৎ জবাব দিলেন, ভিসি স্যারের বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে।’ এই তাহলে অবস্থা। আসলে লোকটি জানতেন না আমি মিডিয়া কর্মী।
আমি ভাবি তাহলে বুঝি ছাত্র রাজনীতি করাই ভালো ছিল। কিন্তু পরিবার থেকে রাজনীতি করা বারণ ছিল। আর যাই করো না কেন ও পথ কখনো মারিওনা বারবার বড়রা এই তাগিদটাই বেশি দিতেন। ছাত্র রাজনীতি না করে আসলেই কি কিছু হারিয়েছি?
ঘটনা-২ : রেল মন্ত্রী বিয়ে করেছেন। ঘটা করে পালিত হল হলুদ, বিয়ে থেকে শুরু করে বৌভাতের অনুষ্ঠান।বৌভাত অনুষ্ঠান নিয়ে বিডি নিউজের সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘এলাহীকাণ্ড!’ বাংলা নিউজ শিরোনাম করেছে ‘এ যেন ইতিহাস!’ আসলেই কি এটা ইতিহাস? আমি কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলাম, আচ্ছা এই বিয়েটাকে আপনারা ইতিহাস বলছেন কেন? তারা জানালেন, আসলে এই বয়সে বিয়ে তো তাই বললাম। তবে ইতিহাস ঘাটলেতো এর চেয়েও ঐতিহাসিক বিয়ের সন্ধান পাওয়া যাবে। যেমন ধরুন হলিউড তারকা হ্যারিসন ফোর্ড্। ৭১ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ২২ বছরের ক্যালিস্টাকে। সেই হিসেবে আমাদের রেলমন্ত্রীর বউয়ের বয়স নেহাত কম নয়।আবার ধরুন, মাইকেল ডগলাস ৬৮ বছর বয়সী এই পাত্রের পাত্রীর বয়স কত জানেন? মাত্র ২৫ বছর। তিনিও নিশ্চয় হনুফা আক্তার রিক্তার চেয়ে বয়সে ছোট।আবার ধরুন হিউ হাফনারের স্ত্রী তার চেয়ে ৬০ বছরের ছোট।
তো আমরা এটা নিয়ে এত মাতামাতি করছি কেন। ভাবছেন সবতো পশ্চিমাদের উদাহরণ দিলাম। আমাদের দেশে কি এমনটা ঘটছে না? অবশ্যই ঘটছে। যারা নিয়মিত পত্রিকা পড়েন তারা হয়তো জানবেন কখনো কখনো আমরা এমন খবরও পড়ি যে নাতির বয়সী মেয়ে নিয়ে পালিয়া গেলেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ। হ্যাঁ এসব নিয়েও বড় বড় নিউজ হত যদি কনের শরীর গয়নার মোড়কে ঢাকা থাকতো কিংবা আপ্যায়ন করা হত হাজার মানুষের।একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে দেখলাম লিখেছে, মন্ত্রীর বৌভাত অনুষ্ঠানের প্রবেশদ্বার থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে ভিক্ষুকদের। বড় বড় বিয়েতে আসলে এমনটাই ঘটে। আগে গ্রামে দেখতাম বিয়ে বাড়িতে ঘরের পেছনের দিকটায় গরীব মানুষ ভীড় করত যাতে অতিথিদের ফেলে দেয়া উচ্ছিস্ট খাবারের ভাগ তারা পায়।খুব খুশি মনেই তারা এ খাবারগুলো খাচ্ছে। পেটে ক্ষুধা নিয়ে কি এত ভাব দেখালে চলবে? রেল মন্ত্রী বিয়ে করেছেন এটা আনন্দের সংবাদ কিন্তু বিষয়টি আরো আন্দদায়ক হতো যদি তিনি এইসব অভূক্ত গরীবদের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা রাখতেন।তিনি আসলে মহৎ হতে চাননি, তিনি চেয়েছেন ইতিহাস গড়তে। বিশ্বব্যাপীতো এখন এটাই হচ্ছে।
ঘটনা-৩ : সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতানের পুত্রবধূ সামারুক মাহজাবিন ওরফে সুমীর অস্বাভাবিক মৃত্যু এলামেলো করে দেয় সব হিসেব।এটা যে নতুন ঘটনা তা কিন্তু নয়। এর আগেও আমাদের দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। ফলে অনেক মেধাবী তরুণীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মেধাবী সুমিকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল পাত্র ব্যারিস্টার জেনে। হয়ত সুমীর পরিবার ভেবেছিল স্থানীয় এমপির ছেলের সাথে বিয়ে হলে বাড়তি পাওনা হিসেবে পারিবারিক মর্যাদাও বেড়ে যাবে। বিয়ের পর যখন সুমীর বাবা মা জানতে পারেন ছেলে ব্যারিস্টারতো দূরের কথা এলএলবিটাও শেষ করতে পারেন নি তখন মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেছে। মান সম্মানের কথা ভেবে মেয়েকে হয়তো বলেছেন, একটু সহ্য কর মা। সহ্যের সীমা যে অতিক্রম হয়ে গিয়েছিল সেটা বোধ হয় বুঝতে পারেনি ডা: সামারুখের পরিবার।
আসলে আমাদের সমাজে মেয়েদের অবস্থানের পরিবর্তন কতটা হয়েছে সেটা নিয়ে বিতর্ক্ আছে। আমাদের পরিবার এখনো ভাবে মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসলে বদনামের ভাগীদার হতে হবে। হ্যাঁ, অনেক সময় যে মেয়েরা শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বেড়িয়ে আসেনা তা কিন্তু নয় তবে এর বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই মেয়েকে একা নিতে হয় কারণ পরিবার সবসময় এক বিবাহিত মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারেনা। আর এই সাহসগুলো আজকাল বেশি দেখাচ্ছে কর্ম্জীবি মেয়েরা।অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে তারা সফলতার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে। কিন্তু ঐসব মেয়েদের দেখলে মেয়েরাও হয়ত বলে, দেখ মেয়েটা ভালো না।শ্বশুরবাড়ি থাকতে পারেনি। কিন্তু নিজের আত্মসম্মানের সঙ্গে আপোষ করতে পারে কজন বলুনতো? সেটা যদি সামারুখ করতেই পারতো তবে তাকে হয়তো মরতে হত না। অনেক বিবেকবান শিক্ষিতা নারীরা তাই হয়তো অনেক সময় আত্মহননের পথও বেছে নেয়। কিন্তু কেন সে এটা করল সেই প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। এভাবে যদি মেধাবীরা অকালে চলে যায় তবে কি থেকে যায় আমাদের জন্য? শুধু কি আফসোস? ধিক জানাই এসব আফসোসকে।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক।
১৭.১১.২০১৪
