কেঁচো চাষ : বদলেছে গারো নারীর ভাগ্য
প্রকাশিত : ০৯:১৮ এএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৩ বুধবার | আপডেট: ০৮:১৭ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩ বুধবার
এ কিউ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম
গোপালপুর (টাঙ্গাইল) থেকেঃ সংসারের নৈমিত্তিক কাজের পাশাপাশি কেঁচো পালনের মাধ্যমে জৈব সার উত্পাদন করে ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় এলাকায় গারো নারীরা৷ গড় এলাকায় ৮-১০ গ্রামের শতাধিক আদিবাসী গারো নারী বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেঁচো পালন করছেন৷ পুরুষের পাশাপাশি অন্যান্য কাজে গারো নারীরা পিছিয়ে থাকলেও এ কাজে অনেকটা পুরুষের তুলনায় এগিয়ে, তাই নারীরা একাজে সাফল্যের দারপ্রান্তে৷
মধুপুর শহর থেকে ১০ কিঃ মিঃ উত্তরে অরণখোলা ইউনিয়নের ধরাটি-কোনাবাড়ী গ্রামে সরজমিনে ঘুরে জানা যায়, তাদের কেঁচো পালনের মাধ্যমে জৈব সার তৈরির সাফল্যের শুরুটা৷ কোনাবাড়ী গ্রামের বিনজামিন রাকসাম (৬২), গারো নারী নেত্রী অর্চনা নকরেক (৪০), ধরাটি গ্রামের আলবিনা তেলসী (৫০), প্রীতি তেলসী (৪০), এলিয়া হাগিদক (৫০) নাসিমা নকরেক (৪২), রুবিনা নকরেক (৪৫) নিসিত হাগিদক (৫২) জানান, প্রথমে তারা সিবিএসডিপি-মধুপুর নামের একটি উপজাতি (তাদের ভাষায় আদিবাসি) গারোদের নিয়ে তাদের ধমর্ীয় আচার অনুষ্ঠানে কৃষ্টি কালচারসহ বিভিন্ন কাজ উন্নয়নের জন্য ধরাটিতে কাজ শুরু করে৷ অন্যান্যের মধ্যে গারো নারী পুরুষদেরকে কিভাবে বিনা পুঁজিতে স্বল্প পরিসরে এগিয়ে নেওয়া যায় এজন্য কেঁচো চাষের মাধ্যমে জৈব সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেন৷ ওই ধরাটি অফিসের নাইট গার্ড নিশিত নকরেক (৪২) অফিসের বাইরে থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনেন৷ পরে নিজ উদ্যোগে হাতে গোনা ২০-২৫টি কেঁচো নিয়ে দুটি চারিতে শুরু করেন কেঁচো চাষ৷ প্রথম ২-৩ মাসে লাভ আসতে শুরু করে৷ বাড়তে থাকে কেঁচোর বংশবৃদ্ধি৷ নিশিত চাকুরির পাশাপাশি বাড়াতে থাকেন কেঁচোর বাসস্থান চারির সংখ্যা৷ আশপাশের গারো নারী-পুরুষ তা দেখে কেঁচো চাষের জন্য পরামর্শ নিতে থাকে নিশিতের কাছ থেকে৷ বাড়তে থাকে আশপাশের লোকজনের আগ্রহ৷
নিশিত জানায়, প্রথমে সে দুটি মাটির চারিতে কেঁচো চাষ শুরু করেছিলেন বর্তমানে তার বাড়িতে ৮টি চারি রয়েছে৷ মাসে দু'বার কেঁচো সার বিক্রি করা যায়৷ কেঁচো ব্যাপক পরিমানে বংশ বৃদ্ধি করে৷ একটি চারিতে ২০-২৫টি কেঁচো দিয়ে চাষ শুরু করা যায়৷ ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে কেঁচো ব্যাপক পরিমাণে বাড়ে৷ বর্তমানে তার প্রতিটি চারিতে এক হাজার থেকে ১২ শত কেঁচো রয়েছে৷ তার ৮টি চারিতে ৮-১০ হাজার কেঁচো রয়েছে৷ প্রতিটি কেঁচো দুই টাকা দামে বিক্রি করা যায়৷ মাসে দু'বার কেঁচো তৈরি জৈব সার বিক্রি করা যায়৷ প্রতি কেজি জৈব সারের মূল্য ৫-১২ টাকা পর্যন্ত৷ একটি চারি থেকে ২০-৩৫ কেজি পর্যন্ত জৈব সার উত্পাদন করা যায়৷ মাসে ৪ থেকে ৭শত টাকা আসে প্রতি চারিতে৷ তিনি জানালেন ৮টি চারি থেকে ৪ হাজার টাকা উপার্জন হয়৷ ক্রেতারও কোন অভাব নেই৷ নগদ দামে বাড়ী থেকে কিনে নেয়৷
তিনি আরো জানান, কেঁচো অমেরুদন্ডী প্রাণী৷ এ প্রাণীকে পোষতে বাড়তি কোন জামেলা নেই৷ বাড়ির চারপাশ কিংবা নদীনালা খালবিলসহ প্রভৃতি স্থানে প্রাকৃতিক ভাবে কেঁচো জন্মে থাকে৷ কেঁচোর খাদ্য হচ্ছে জমির উর্বর মাটি৷ গ্রামাঞ্চলের মানুষের মুখের প্রবাদ আছে 'যে জমির মাটি যত বেশি উর্বর, সে জমিতে তত বেশি কেঁচো পাওয়া যায়'৷ ছয়ঋতুর এদেশে বষর্াকালে হাতের কাছে বেশি কেঁচোর দেখা যায়৷ হাঁস ও মাছের শখের খাবার হচ্ছে কেঁচো৷ আবার কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙ্গলও বলা হয়৷ শুধু প্রকৃতির লাঙ্গলই নয়, কেঁচো ফল ফসলের জন্য জৈব পরিবেশ বান্ধব সার ও তৈরি করতে পারে৷ তবে এই কেঁচোর বীজ ও বংশবিস্তার একটু প্রযুক্তিগত৷ আর এই এই কেঁচোর মাধ্যমে জৈব সার উত্পাদন করে মধুপুর গড় এলাকার মমিনপুর, ধরাটি, কোনাবাড়ী, দোখলা, ইদিলপুর আশপাশের কয়েক গ্রামের প্রায় শতাধিক উপজাতি গারো নারীরা খোঁজে পেয়েছেন জৈব সার তৈরির নতুন ঠিকানা৷ উত্পাদিত জৈব সার ও বীজ কেঁচো বিক্রি করে গুনছেন বাড়তি আয়৷ কেঁচো পালন বাড়তি জমি, ঘরবাড়ি, অঢেল অর্থ, শ্রমিক, খাদ্য ও কীটনাশকের প্রয়োজন নেই৷ মাটির তৈরি চারি (মাটির তৈরি গোলাকার বড় পাত্র) হলেই বাড়ির যে কোনো স্থানে অনায়াসে চাষ করা যায়৷ চারিতে প্রথমে ১০-১৫টি কেঁচো দিয়ে চাষ শুরু করতে হয়৷ তারপর বাড়তে থাকে কেঁচোর সংখ্যা৷
কেঁচোর খাবার কাঁচা ঘাস, লতাপাতা, খড়কুটা, কাঁচা গোবর প্রভৃতি৷ বাড়তি কোন পুঁজি লাগে না৷ রাসায়নিক সার নিশিতের পছন্দ নয়৷ তার বাড়তি আঙ্গুর, আতা, জলপাই, পেয়ারা, ছবেদা, আম, জাম, কলা, ফুল ও ফলসহ প্রভৃতি চাষ রয়েছে৷ তিনি এসব চাষ করেছেন তার তৈরিকৃত কেঁচো জৈব সার দিয়ে৷ এতে পরিবেশেও ভাল থাকে৷ ফলও খেতে স্বাদ বেশি৷ পুষ্টির মানও অনেক৷ নিশিত জানায় বাণিজ্যিক ভাবে চাষ শুরু হলে রাসায়নিক সারের চাহিদা অনেকটাই কমানো যেত৷ কৃষকদের সারের মাধ্যমে ফসল উত্পাদন করার জন্য ঘুরতে হতো না৷ নিজের তৈরি সার দিয়েই যেকোন ধরনের ফসল চাষ করা যেত৷
কথা হয় আরেক কেঁচো চাষী বিনজামিন রাকসামের (৬২) সঙ্গে৷ তিনি জানান, ধরাটি গ্রামে সিপিএসডিপি অফিসে ৪ থেকে ৫ বছর আগে কেঁচো পালনের মাধ্যমে কমপোষ্ট জৈব সার তৈরির একটি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি করা হয়৷ অতিথি হিসাবে বিনজামিন মাস্টার বসে থেকে কেঁচো পালনের ইতিবৃত্ত আত্বস্ত করেন৷ জেনে নেন কেঁচো পালনের যাবতীয় নিয়ম৷ তার বাড়ীর পাশে নিশিত হাগিদকের নিকট থেকে প্রতিটি মা কেঁচো ২টাকা মূল্য কিনে আনেন৷ প্রথমে স্বল্প পরিসরে ২-১টি চারিতে চাষ করেন৷ প্রতিটি চারিতে ৩০টি কেঁচো দিয়ে প্রথম চাষ শুরু৷ ৩০টি কেঁচো বংশবৃদ্ধি পায়৷ এভাবেই ২-৩টি চারিতে চাষ করেন৷ নিজেই অবসর সময়ে বাড়ীর চার পাশ থেকে লতা-পাতা ফুলকড়ি, ঘাস, কলার পাতা, বিভিন্ন খাদ্য সংগ্রহ করে কেঁচোর চারিতে এনে দেন৷ এভাবেই চলে তার বাড়তি সময়৷ মনের আনন্দে কাজ করেন৷ ১৫ দিনে একটি কেঁচোর চারিতে ২০ থেকে ৪০ কেজি খাদ্যের প্রয়োজন হয়৷ খাদ্যেগুলো খাওয়ার ১৫-২০ দিন পর৷ তা জৈব সারে রুপ নেয়৷ তারপর চারির কেঁচোসহ সব ময়লা আবর্জনা মাটিতে ঢেলে কেঁচোও জৈব সারগুলো আলাদা ভাবে বাছাই করতে হয়৷ পরে সারগুলো কেজি হিসাবে বিক্রি করা হয়৷ কেঁচোগুলো আবার চারিতে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ এভাবেই ১৫ দিন পর পর জৈব সার পাওয়া যায়৷ তার বাড়িতে এখন ১০-১৫টি চারি রয়েছে৷ মাসে ৫-৭ হাজার টাকা বাড়তি আয় আসে বলে তিনি জানান৷ এভাবে মাসের মাসের পর মাস বছরের পর বছর আসে কেঁচো সার৷ আসে মা কেঁচো বাড়তি কোন খরচ ছাড়াই বাড়তি আয়ের পদ খোজে পেয়েছেন বিনজামিনের মতো আরো অনেক গারো গারো নারি-পুরুষরা৷ তার মতে, মাটির চারিতে নয় যদি ইট, সিমেন্টের দ্বারা হাউজ তৈরি করা যেত তাহলে কেঁচো চাষ করে আরো বেশি লাভবান হওয়া যেত৷ একসাথে অনেকগুলো কেঁচো পালন করতে কোন সমস্যা হতো না৷
তিনি আরোও জানান, বাড়ীর ফসলে আমরা কয়েক বছর যাবত কেঁচো জৈব সার ব্যবহার করে ভাল ফলাফল পাচ্ছি৷ আমাদের দেখাদেখি এলাকার কৃষকরা তাদের কলা, ধান, আনারস, মরিচ, শশাসহ অন্যান্য কৃষি ফসলে কেঁচো জৈব সার ব্যবহার করছে৷ দাম কম থাকায় তারা মনের আনন্দেই পরিবেশ সম্মত এই সার ব্যবহার করতে কোন চিন্তা করে না৷ চাহিদাও বেশি চাহিদা অনুযায়ী চাষ করা গেলে রাসায়নিক সারের উপর চাহিদা অনেকটা কমে যেত৷ তার এখন মাসে ১৪-১৫ মন কেঁচো সার উত্পাদন হয়৷ তার ঘরের বাড়ান্দায় সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন মাটির চারিগুলো নিজেই খাবার দেন৷ বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন ফলের বাগান৷ পরিপাটি জীবন৷ তার স্ত্রী স্থানীয় ক্লিনিকে চাকরি করেন৷ নিজেও অবসর নিয়েছেন৷ সুখের সংসার৷ ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করছে৷ বিয়েও দিয়েছেন৷ তিনি গারো সমাজে নেতৃত্ব দেন৷ তার এ কাজ দেখে সবাই অবাক৷ এভাবে বিনজামিনের দেখাদেখি মমিনপুর, ধরাটী এলাকায় ২০-২৫ জন কেঁচো চাষি হয়েছে৷ সবাই নিজের নিজ নিজ জমিতে কেঁচো সার ব্যবহার করছে৷ কেউ বা আবার বিক্রিও করছে৷
কথা হয় এলেয়া হাগিদক, শিপরা নকরেক, আলবিনা তেলসি, প্রীতি তেলসি, নাসিমা নকরেক এর সাথে৷ তারা জানান তাদের এলাকায় সিপিএসডিপি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেঁচো সার তৈরিতে গারো নারী-পুরুষরা এগিয়ে আসছে৷ তাদের মতো কেঁচো চাষ লাভজনক৷ সুবিধা মতো চাষ করা যায়৷ বাড়তি কোন খরচ নেই৷ যেকোন জায়গায় চাষ করা যায়৷ সার বিক্রি করতেও কোন ঝামেলা নেই৷ রাসায়নিক, বিষমুক্ত, ঝামেলামুক্ত, নিজের তৈরি সার দিয়ে সহজেই ফসল চাষ করা যায়৷ ফলনও হয় ভালো৷ তাদের মতে এই চাষ বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি ফসল উত্পাদনে কেঁচো চাষ ব্যবহারের পাশাপাশি এই সার বিক্রি করে এলাকার উপজাতি গারো নারী-পুরুষরা আর্থসামাজিক ভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে৷ এজন্যে তারা বাণিজ্যিক ভাবে এ চাষের জন্য সরকারী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়৷
১৩ নভেম্বর'২০১৩ 