পথশিশু : নেই জীবনের নিরাপত্তা
প্রকাশিত : ০৭:০৬ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৭:০৬ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০১৪ বৃহস্পতিবার
রাতুল মাঝি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান, শিক্ষা, বিনোদন ও নিরাপত্তা লাভের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত দেশের পথশিশুরা। সারা দেশে প্রায় চার লাখ পথশিশু রয়েছে। এদের মধ্যে ঢাকাতেই প্রায় দুই লাখের বাস, যাদের বয়স ১৮-এর নিচে। এই বিপুল সংখ্যক শিশুর জন্য এমন কোন স্থান নেই যেখানে বিপদের সময় তারা একটু ঠাঁই পাবে। মেয়ে পথশিশুরা আরো বেশি নিরাপত্তাহীন। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার ‘অপরাধে’ তারা শিকার হয় অনেক বেশি লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশ থেকে যে সংখ্যক শিশু প্রতিবছর পাচার হয় তাদের এক বিরাট অংশ এই পথশিশু। পাচরকারী সংঘবদ্ধ দল সুযোগ পেলেই ধরে নিয়ে যায় এসব শিশুকে। এদের এমন কেউ নেই যে খোঁজ করবে। তাছাড়া রয়েছে পুলিশ ও নাইট গার্ডের অত্যাচার। তবে সঙ্গে যা টাকা-পয়সা থাকে তা দিয়ে দিলে ছেড়ে দেয়। অনেক সময় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এরা এই শিশুদের ওপর হামলা করে। মারধর করে তাদের ধরে ভবঘুরে কেন্দ্রে নিয়ে যায়। আবার কখনো কোর্টে চালান করে দেয়। এদিকে, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে বসবাসের কারণে পথশিশুরা আক্রান্ত হয় নানা রোগে। সবচেয়ে বেশি হয় চর্ম রোগ, ডায়রিয়া এবং যৌনরোগ। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে কোনো প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা না থাকায় তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েও আহত হয়। হাত-পা কেটে-ছিঁড়ে যায়। কিন্তু টাকার অভাবে কোনো চিকিৎসা করাতে পারে না তারা। চিকিৎসা না করানোর ফলে অনেক সময় গুরুতর ক্ষতস্থানে পচন দেখা দেয়। আর এভাবে ভুগতে ভুগতেই একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পথশিশুরা সাধারণ চর্ম রোগে সবচেয়ে বেশি ভোগে। তাছাড়া তারা নানা রকম ইনজুরি, ডায়ারিয়া ও পেটের পীড়ায়ও ভোগে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় জানা যায়, কঠিন শ্রমের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এসব শিশুদের স্বাস্থ্যহানি ঘটে। তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। দূষিত পানি পান করা ও পচা-বাসি খাবার গ্রহণ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের অভাবের কারণে নানা রোগে ভোগে তারা। বাংলাদেশের শহর এলাকার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, শব্দদূষণের ফলে পথশিশুরা কানে কম শোনে বা তাদের শ্রবনশক্তি হ্রাস পায়, আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয় এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়। অধিকাংশ পথশিশুই গ্লাস. ম্যাচ, সিমেন্ট, চামড়া, স্টিল, চিংড়ি, ওয়েল্ডিং ফ্যাক্টরিতে, ইটের ভাটা, কামারশালা, প্রিন্টিং প্রেস, মেটাল ও ডাইং কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয় পেপটিক আলসার, চর্মরোগ, টিটেনাস, ঠান্ডা, কফ, এলার্জিক ব্রনকাইটিস, অ্যাজমা, গেঁটেবাত ইত্যাদি রোগে। এছাড়া বিভিন্ন সময় তারা নানান ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। দীর্ঘদিন এসব স্থানে কাজ করার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্থ হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া তারা বলছেন, যেসব শিশু আবর্জনার ময়লার স্তুপ থেকে কাগজ, প্লাস্টিক ইত্যাদি জিনিস কুড়ায় তারা বেশি ভাগই চর্মরোগে ভোগে। তারা বিভিন্ন বিষাক্ত পোকা মাকড়ের কামড়েরও শিকার হয়। ইউনিসেফ ও শিশু অধিকার ফোরাম পরিচালিত এক যৌথ জরিপে দেখা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ফলে শিশুদের নানাভাবে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত ও নৈতিক ভাবমূর্তির অবনতি ঘটে। তাদের শরীর ভেঙে যায়, স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও তাদের কর্মশক্তি অকালে লোপ পায়। পথশিশুরা মাদক বিক্রেতাদের ফাঁদে পা দিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন মানুষের লাঞ্চনা, বঞ্চনা, অপমান, নির্যাতন সহ্য করে ছোটবেলা থেকেই কঠিন জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ার কারণে পথশিশুরা একটা পর্যায়ে গিয়ে নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। দীর্ঘদিন বিষণœতা, হতাশায় ভুগে অনেক শিশুই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পথে বসবাসের কারণে এসব শিশুর মধ্যে আচরণগত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু এ সমস্যাগুলো তাদের কাছে স্বাভাবিক। রাস্তায় জীবন যাপন করতে গিয়ে তারা এ আচরণগুলোরই সন্মুখীন হয়। তবে তাদের চারপাশে সভ্য সমাজে বাস করি বলে আমাদের কাছে এসব আচরণ অস্বাভাবিক মনে হয়। মানসিক চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে তারা খুবই অনগ্রসর থাকে। মেয়ে পথশিশুরা পথেঘাটে নানাভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সবচেয়ে বেশি। ২১.১১.২০১৪
