ঢাকা, বুধবার ১৫, জুলাই ২০২৬ ১৮:১০:২৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

১১৯তম নজরুল-জয়ন্তী আজ : ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’

এসএম মুন্না ও সালেহীন বাবু

উইমেননিউজ২৪.কম

প্রকাশিত : ১২:০৮ এএম, ২৫ মে ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০৫:০৭ পিএম, ২৫ মে ২০১৮ শুক্রবার

তাঁর লেখনিতে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা প্রকাশ পেয়েছে প্রবলভাবে। এ কারণে তিনি বিদ্রোহী। তার প্রেমিক রূপটিও প্রবাদপ্রতিম। তাই তো তিনি কবিতার ছত্রে ছত্রে বলেছেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়।’ পৃথিবীতে এমন ক’জন আছেন যিনি প্রেমের টানে রক্তের সর্ম্পককে অস্বীকার করে পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন। তিনি হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে)। সেই সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৯তম জয়ন্তী। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে মহান এই কবিকে। এরই জাতীয় পর্যায়ে রাজধানী ঢাকাসহ কবির স্মৃতিধন্য চট্টগ্রাম, ত্রিশাল-দরিরামপুর, কুমিল্লা ও দৌলতপুরে তিন দিনের নজরুল-জয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। আজ শুক্রবার ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির মাজার ভরে উঠবে অগণিত মানুষের নিবেদন করা ফুলে।

নজরুল-জয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, পাশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। বাবা কাজী ফকির আহমদ ও মা জায়েদা খাতুন। সীমাহীন দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে কবির আগমন ঘটে পৃথিবীতে। দারিদ্র্যের কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু প্রতিভাবান নজরুল নিজের চেষ্টায় অনেক পড়াশোনা করে সমৃদ্ধ করেছেন তার মনন ও চিন্তার জগৎ। ছোটবেলায় রুটির দোকানে কাজ করা, লেটোর দলে যোগদান, যৌবনে যুদ্ধযাত্রা, সাংবাদিকতা, রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতা সব মিলিয়ে বিচিত্র জীবন ছিল তাঁর।

মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। যা সত্যি বিষ্ময়কর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন পর্যন্ত বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছে তাঁর গান, রচনাবলী ও কবিতা।

মানবতার মুক্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা-সোচ্চার।

দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়েও তিনি কখনো আপস করেননি। মাথা নত করেননি লোভ-লালসা, খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত ও বৈভবের কাছে। ‘চির উন্নত মম শির’ বলে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। কবিতার পাশাপাশি বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা গজলের প্রবর্তক বলা হয় তাকে। তিনিই প্রথম বাংলা গজল রচনা করেন।

অসাম্প্রদায়িক ও শোষনমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়ার মানসে সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম । এ সব ক্ষেত্রে তিনি সংগ্রামী ও পথিকৃৎ লেখক।

তাঁর লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : ১১৯তম নজরুল-জয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তাঁরা কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, ‘আমাদের কর্ম, চিন্তা ও মননে কবি নজরুলের অবিনশ্বর উপস্থিতি বাঙালি জাতির প্রাণশক্তিকে চিরকাল জাগরিত রাখবে। বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর লেখায় অন্যায়, অসত্য, নির্যাতন, পরাধীনতার গ্লানি ও শৃঙ্খল মোচনের দীপ্ত উচ্চারণ যুগ যুগ ধরে মানুষকে সাহসী হওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।’


আবদুল হামিদ আরও বলেন, ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ও ভালোবাসার বহির্প্রকাশ হিসেবে তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে এনে বসবাসের ব্যবস্থা করেন।’ তিনি বাণীতে উল্লেখ করেন, ‘নজরুল যে অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন, তা বাস্তবায়নে আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘নজরুল তাঁর প্রত্যয়ী ও বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে এদেশের মানুষকে মুক্তিসংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছেন, জাগ্রত করেছেন বাঙালি জাতীয়তাবোধ। বিদ্রোহী কবির অগ্নিঝরা কবিতা ও গান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিল অনন্ত প্রেরণার উৎস।’


তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা নজরুলকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। এদেশের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও প্রীতিপূর্ণ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।’


শেখ হাসিনা বলেন, ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে এনে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। জাতির পিতা অসুস্থ নজরুলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। শৌর্য-বীর্য ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের মন্ত্রে উজ্জীবিত জাতীয় কবির গান ‘চল্ চল্ চল্’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত।’

কর্মসূচি : নজরুল-জয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এতে রয়েছে কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতিহা পাঠ, শোভাযাত্রা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করবে।

জাতীয় পর্যায়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক যোগে স্মৃতিধন্য ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আজ শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটায় কবির স্মৃতি বিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তিনদিনের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন।এতে বিশেষ অতিথি থাকবেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি বেগম সিমিন হোসেন রিমি এমপি। নজরুল স্মারক বক্তৃতা করবেন বেগম আখতার কামাল। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তি সচিব মসিউর রহমান। এ ছাড়াও ঢাকা, ত্রিশাল , কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে সরকারী প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কর্মসূচি পালন করা হবে।

ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে কবির সমাধিতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি পালন শুরু হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

বাংলা একাডেমি : দিবসটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে নজরুল বিষয়ক একক বক্তৃতা ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির সচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। ‘নজরুল : চিরবিদ্রোহী’ শীর্ষক একক বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম।


একক বক্তৃতায় অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, ‘ব্যক্তিত্বের অনমনীয় দৃঢ়তায় কাজী নজরুল ইসলাম যেমন সাম্রাজ্যবাদ ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন ঠিক তেমনি সমকালীন সমাজের হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নিজের জীবন ও সাহিত্য দিয়ে বিদ্রোহ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর মতো অসাম্প্রদায়িক মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল। আবার সাহিত্যে ও সঙ্গীতে প্রগতির কণ্ঠে তিনি স্বসম্প্রদায়ের মুসলমানদের জাগিয়ে দিয়ে গেছেন।’ একক বক্তা আরও বলেন, ‘নজরুলের জীবনকথা লিখতে গিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করেছেন আমাদের। তাই এখন প্রয়োজন নজরুলকে তাঁর প্রকৃত স্বরূপে আবিষ্কার ও চর্চা।’


সভাপতির অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম বলেন, ‘নজরুলের জীবন এক বিদ্রোহ, এক বিস্ময়। ধরাবাঁধা জীবন ও সাহিত্যধারার বিপরীতে তিনি প্রাণের উদ্দাম আবেগে সামনে এগিয়ে চলেছেন, একই সঙ্গে আমাদেরও দিয়েছেন সামনে চলার দিশা।’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুলগীতি পরিবেশন করেন শিল্পী লীনা তাপসী খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মাহবুবা রহমান।

শিল্পকলা একাডেমি : সকাল ১১টায় একাডেমির জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।একাডেমির সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী এর সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ অধ্যাপক হোসনে আরা জলি। আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে একক সঙ্গীত পরিবেশন করবেন নবীন-প্রবীণ শিল্পীরা।

বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ছাড়াও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং এফএম রেডিও স্টেশনগুলো দিবসটি উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো এরই মধ্যে প্রকাশ করেছে বিশেষ লেখা।