শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ০২:৪২ পিএম, ২৫ মে ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০৮:৩৩ পিএম, ২৫ মে ২০১৮ শুক্রবার
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ’বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ভবন উদ্বোধন করতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক পুরোনো। ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতী আমাকে দেশিকোত্তম ডিগ্রি প্রদান করে। আমার ইচ্ছে ছিল এখানে বাংলাদেশ বিষয়ে চর্চার জন্য একটি আলাদা জায়গা থাকুক। আজ সে আশা পূর্ণতা পেলো।
আজ শুক্রবার বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ সব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তথা আচার্য নরেন্দ্র মোদী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী৷
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১০ সালে আমার ভারত সফরের সময় এই ভবনটি স্থাপনের ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত এটি আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি গভীরভাবে আনন্দিত। আমি মনে করি কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে এটি একখণ্ড বাংলাদেশ। যাকে কেন্দ্র করে শান্তিনিকেতনের বুকে জেগে উঠবে বাংলাদেশের আলো, যে আলো রবীন্দ্রময় নিশ্চয়ই, তবু তার মধ্যে আছে স্বকীয়তা। আশা করছি, এ প্রতিষ্ঠানটি তার অভীষ্ট পূরণে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবন স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ায় সেদেশের সরকার, পশ্চিম বাংলা সরকার এবং বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষসহ সে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাঙালির জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে অবদান ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কবি গুরুর এই সৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি বাঙালির জীবনে তিনি উজ্জ্বল বাতিঘর। কবিগুরুর হাতে গড়া এক অনন্য প্রতিষ্ঠান এই শান্তিনিকেতন। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে বৃহত্তর বিশ্বকে গ্রহণের উপযুক্ত করে তোলার জন্য জ্ঞানদান করার উদ্দেশ্যে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবন স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ায় সেদেশের সরকার, পশ্চিম বাংলা সরকার এবং বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষসহ সে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাঙালির জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে অবদান ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।
নিজের রবীন্দ্র চর্চার শুরুর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার রবীন্দ্র চর্চার শুরু আব্বার কাছ থেকে। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে আরও কাছাকাছি এসেছি রবীন্দ্র সাহিত্যের। এখনও সময় পেলেই আমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ি, গান শুনি। রবীন্দ্রনাথের লেখা দুঃখ-বেদনা-ক্লেশ দূর করে হৃদয়ে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে আছেন আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে সেদিনের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
আমাদের ভাষার লড়াই থেকেই শুরু হয়েছিল স্বাধিকারের লড়াই। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে তার সাহিত্য ও গানকে নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের মানুষ। সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করেছিলাম আমাদের হৃদয়ে, চেতনায় ও বিশ্বাসে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের দিয়েছে প্রেরণা, যুগিয়েছে উৎসাহ ও সাহস।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সে সময় ভারতের জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারত সে সময়ে আমাদের প্রায় এক কোটি গৃহহারা মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বহু সংখ্যক সৈন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। এই বিপুল আত্মত্যাগের কথা বাংলাদেশের মানুষ কখনও ভুলবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ছোটবোন রেহানাসহ আমাকে ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই দুঃসময়ে ভারতের জনগণ যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তা আমরা কোনদিন ভুলবো না।
তিনি বলেন, বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে প্রচলিত ও অপ্রচলিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারতের বহুমুখী ও বহুমাত্রিক এ সম্পর্ক বিগত সাড়ে নয় বছরে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছে। আমরা আজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, উভয় দেশ ভবিষ্যতেও এ সব সহযোগিতা বিদ্যমান রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ভবনে গবেষকদের সহায়তার জন্য একটি পাঠাগার, অডিটোরিয়াম, ক্যাফেটারিয়া, ডিজিটাল জাদুঘর ও আর্কাইভ ও অন্যান্য সুবিধাদি সংযুক্ত থাকবে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশ সরকার ‘বাংলাদেশ ভবন’ রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে ১০ কোটি রুপির সমপরিমাণ একটি স্থায়ী তহবিল গঠন করবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বাংলাদেশ ভবন হবে একটি অনুপম কেন্দ্র। শিক্ষার্থী এবং গবেষকগণ এখানে অধ্যয়ন ও গবেষণা করতে পারবেন। এর মাধ্যমে উভয় দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও মজবুত হবে যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে সুদৃঢ় করবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে অন্তর দিয়ে লালন করেছিলেন। তার জন্ম কলকাতায়। কিন্তু জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে বাংলাদেশের পতিসর, শিলাইদহ আর শাহজাদপুরে। খুব কাছ থেকে দেখেছেন নদীমাতৃক গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি আর আমাদের কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সমাজকে। সৃষ্টি করেছেন অসামান্য সব গান, কবিতা, উপন্যাস ও ছোটগল্প। পতিসরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি-সমবায়। প্রবর্তন করেছিলেন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি।
শেখ হাসিনা বলেন, কলকাতা বা অন্য কোথাও নয়, কবিগুরু বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এই বাংলাদেশেরই খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের মেয়ে ভবতারিণীকে। বিয়ের পরে যাকে নুতন নাম দিয়েছিলেন মৃণালিনী। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে ধরে রাখবার জন্য আমরা শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছি।
