আমরা সব ধরণের ছাড় দিতে চেয়েছিলাম : জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশিত : ০৪:৩৭ পিএম, ৫ জানুয়ারি ২০১৫ সোমবার | আপডেট: ০৪:৪১ পিএম, ৫ জানুয়ারি ২০১৫ সোমবার
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম,
ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে বিএনপি-জামাত জোট সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। নির্বাচনের আগে আমরা সংলাপে বসার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব ধরণের ছাড় দিতে চেয়েছিলাম। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রীসভা গঠনের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ ৫ জানুয়ারি। গত বছরের এই দিনে আপনারা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের জনগণের দল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে টানা দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা সংলাপে বসার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব ধরণের ছাড় দিতে চেয়েছিলাম। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রীসভা গঠনের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে অনির্বাচিত সরকারের কোন ব্যবস্থা নেই। আমাদের শুধু একটাই দাবী ছিল, সংবিধানের মধ্য থেকে আমরা নির্বাচন করতে চাই। সেখানে যত ধরণের ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা দিতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামাত জোট চেয়েছিল দেশে একটা অরাজক এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পিছনের দরজা দিয়ে তারা ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল ও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে বিএনপি-জামাত জোট সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা শত শত গাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং ভাংচুর করেছে হাজার হাজার গাড়ি। মহাসড়কসহ গ্রামের রাস্তার দু’পাশের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলেছে। পুলিশ-বিজিবি-আনসার-সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে।
তিনি জানান, তাদের সহিংস হামলা, পেট্রোল বোমা, অগিড়বসংযোগ ও বোমা হামলায় নিহত হয়েছে শত শত নিরীহ মানুষ। সরকারি অফিস, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাতের দোকান এমনকি নিরীহ পশুও তাদের জিঘাংসার হাত থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম-এর সামনে হাজার হাজার পবিত্র কোরান শরীফ পুড়িয়ে দিয়েছে। ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলে এবং ফিসপ্লেট খুলে শতশত বগি এবং রেলইঞ্জিন ধ্বংস করেছে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও অগিড়বসংযোগকে উপেক্ষা করে আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। ভোট দিয়েছেন। গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন।
তিনি আরো বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করেছি। এমন এক অবস্থায় আমরা সরকার গঠন করেছিলাম যখন সমগ্র বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং চরম খাদ্যাভাব চলছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ বিএনপি-জামাতের দুঃশাসন. দুর্নীতি, জঙ্গিবাদী কার্যক্রম এবং দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দমননীতির ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করে সমাজের সকলস্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনি। মানুষের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাস সঞ্চার করি। নব উদ্যমে দেশ গড়ার কাজে মানুষকে সম্পৃক্ত করি।
সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন শুরু করি। দীর্ঘ মেয়াদী প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করি। আজ দেশের মানুষ ভাল আছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া পাঁচটি দেশের একটি- বাংলাদেশ। আমরা ৬.২ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করেছি।
প্রধানমন্ত্রী আরো জানান, ৫ কোটি মানুষ নিন্ম আয়ের স্তর থেকে মধ্য আয়ের স্তরে উপনীত হয়েছে। বিএনপি-জামাতের শেষ বছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ। আমরা তা কমিয়ে ২৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। ২০০৬ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.২ শতাংশ। তা এখন কমে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। মানুষের আয় বেড়েছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে আমরা এককোটি মানুষের কর্মসংস্থান করেছি। ২৫ লাখ মানুুষের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সরকার নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস থেকে ৬ মাসে বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে এই প্রথম নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সেনসিটিভ বাজেট তৈরি হচ্ছে। আজ নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী, রাজাকার-আলবদরদের বিচারের কাজ এগিয়ে চলছে। রায় কার্যকর করা হচ্ছে।। ইনশাআল্লাহ আমরা সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করব। এই বিচার বানচাল করতে, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে অন্ধকারের অপশক্তি যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, জনগণের মঙ্গল চায় না তারা আবারও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি’র নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত। তাদের এই রাজনৈতিক ভুলের খেসারত কেন জনগণকে দিতে হবে?
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে আমি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নাশকতা, মানুষ হত্যা, বোমা-গ্রেনেড হামলা, অগিড়বসংযোগ, জানমালের ক্ষতি করা বন্ধ করুন। আপনার ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আজ আপনি ও আপনার দল সংসদে নেই। আপনি কাকে দোষ দেবেন? আপনার নিজেকেই দোষ দিতে হবে। নাশকতার পথ পরিহার করে শান্তির পথে আসুন। দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উনড়বয়নের জন্য কী কী করতে চান তা মানুষকে জানান। নিজের দলকে গড়ে তুলুন। তাহলেই হয়ত ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থাকবে। যে পথে আপনি চলছেন তা জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা আরও হারাবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ নিরাপত্তা চায়, শান্তি চায়। আমরা অসুস্থ রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। যে রাজনীতি দেশের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য সেই রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
০৫.০১.২০১৫
