ঢাকা, রবিবার ২৯, মার্চ ২০২৬ ১৯:০৫:৩৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দেশে নারীদের তামাক আসক্তি বাড়ছে

সালেহীন বাবু

উইমেননিউজ২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:১৩ এএম, ৩১ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০২:২৩ এএম, ১ জুন ২০১৮ শুক্রবার

মানসিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে দেশে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা ছয় গুণ বেশি। এছাড়া দেশে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যান। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পৃথক পৃথক গবেষণায় এ উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তামাক আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে নারীরা। 

 

তামাকজনিত মৃত্যুর ৮০ ভাগই হয় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। চিকিৎসকদের তামাকবিরোধী সংগঠন ‘ইউনাইটেড ফোরাম এগেইন্সট টোব্যাকো’র সাংগঠনিক সম্পাদক ও ‘ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ’-এর অধ্যাপক ডা, সোহেল রেজা চৌধুরী একটি গবেষণা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে ৪৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ১৩ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করেন, যার মধ্যে ২৩ ভাগ (২ কোটি ১৯ লাখ) ধূমপানের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার করেন এবং ২৭ দশমিক ২ ভাগ (২ কোটি ৫৯ লাখ) ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন।

 

তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের প্রায় ৭ ভাগ অর্থ্যাৎ ২৮ লাখ ৯১ হাজার কিশোর-কিশোরী তামাক ব্যবহার করে। এছাড়াও তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যু বরণ করে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, তামাকখাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায় তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে তার দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। তামাকজনিত মোট ক্ষয়ক্ষতি হিসেব করলে তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ শতাংশ।


গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০০৯ অনুসারে, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৬৩ শতাংশ লোক অর্থাৎ ১ কোটি ১৫ লক্ষ কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। ৪৫% অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন।


জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যায়। যা অন্যান্য নিম্ন আয়ের দেশের গড় থেকে বেশি। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। অপরদিকে জাতীয় অর্থনীতি তথা সমৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়।


তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যান। ৪৫ শতাংশ পুরুষ ও ২ শতাংশ নারী ধূমপান করেন। এছাড়া নারীরাও বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করে থাকেন।


তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার তথ্য অনুযায়ী, দেশে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। তবে বর্তমানে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে জানান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের।

 

তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোয় নারী-পুরুষ ধূমপায়ীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের দেশে পুরুষ ধূমপান করলেও নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা ছিল খুব কম। অথচ এখন নারীরা ধূমপানে আসক্ত হচ্ছে। সিগারেট কোম্পানিগুলো তাদের বাজার বাড়াতে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীদের টার্গেট করে বিভিন্ন ধরনের সিগারেট তৈরি করছে। বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে নারীদের ধূমপানে আকৃষ্ট করছে। এতে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিকগুলো জেনেও নারীরা ধূমপান করছে বলে জানান জুবায়ের। তিনি বলেন, ধূমপান যে কোনো মানুষের জন্যই ক্ষতিকারক।


বিশ্বে ধূমপায়ীর সংখ্যা নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ক্রোয়েশিয়া। ওই প্রতিবেদনের বরাতে ক্রোয়েশিয়া উইক জানায়, ২২টি দেশকে নিয়ে করা ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ধূমপান করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রোয়িশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের গবেষণা তথ্য থেকে এটি জানা গেছে। নারী ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরেই আছে ক্রোয়েশিয়া।


নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ার প্রধান কারণ মানসিক অস্থিরতা বলে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহনূর হোসেন বলেন, নগরজীবনের তীব্র প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া অনেকেই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তারা সামাজিক সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়। ফলে অনেকেই মাদক ও ধূমপানে অভ্যস্ত হয়।


মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, সমাজের অবক্ষয় পরিবারকে গ্রাস করছে। নারীও তার থেকে দূরে নয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, হতাশ পুরুষ যেমন বাইরের জগৎটাকে হাতের মুঠোয় পায়, নারীর জন্য সে জগৎ নিয়ন্ত্রিত। তাই বাধ্য হয়েই নারী ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থেকে ধূমপানকেই মাধ্যম করে হতাশা ভুলে থাকতে চায়। হতাশার ধারাবাহিকতায় নারী আত্মহত্যার দিকেও পা বাড়ায়।


পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক তথ্যে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন বিড়ির পেছনে খরচ হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বছর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা। বেসরকারি সংগঠন ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ জানায়, নিম্ন আয়ের মানুষরা তাদের আয়ের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ টাকা বিড়ির পেছনে খরচ করে। প্রতিদিন একজন ধূমপায়ী ৭ থেকে ৯ টাকার বিড়ি কেনে। সিগারেটের মতো বিড়িও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।


মাদকবিরোধী সংগঠন মানস সভাপতি ডা. অরুপ রতন চৌধুরী বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দেশে বর্তমানে প্রতিবছর তামাকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। প্রতিদিন মৃত্যু ঘটছে ৬৮০ জনের। সেই হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় ২৮ জন এবং প্রতি দুই মিনিটে একজন।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বিড়ি ও তামাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন চলছে মূলত শিশু ও নারী শ্রম ব্যবহার করে। এসব কারখানায় কাজ করে শিশু ও নারীরা পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হচ্ছে। এভাবে কোন না কোন ভাবে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার না করেও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে প্রায় এক কোটি নারী।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান কিন্তু স্থিতিশীল নয়। দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এই বিপুল বৈষম্য টিকিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়।


শহরের অনেক মেয়েরাই এখন ধূমপানে আসক্ত। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ধূমপান নিতান্তই স্বভাবিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রান্তিকের মাঠে অনেক মেয়েদেিই প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা গেল। এ যেন নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে তেমন একটা সদুত্তোর দিতে পারেনি তারা। আসলে অনেক মেয়ের কাছে এটি অতি আধুনিকতার নামে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন এবং চর্বণযোগ্য তামাক গ্রহণের প্রবণতা পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। দিন দিন এ ধরনের তামাক গ্রহণের প্রবণতা আরও বাড়ছে। তামাকবিরোধী একাধিক সংস্থা ও সংগঠনের গবেষণায় দেখা গেছে, জর্দা ও গুলের কৌটায় উৎপাদনকারী হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর বেশির ভাগের কোনো অস্বিত্ব নেই।

 

সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল বলছে, তারা অর্ধেকের বেশি জর্দার কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। সামাজিক সংগঠন তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) এর সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যার চেয়ে নারীর সংখ্যা ছয় গুণ বেশি।

 

তামাকবিরোধী কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, নীতিনির্ধারকদের মাথায় ধোঁয়াযুক্ত তামাকের ক্ষতির বিষয়টিই বেশি থাকে। ধোঁয়াবিহীন তামাকের বিরুদ্ধে তাই প্রচারণা কম। এই তামাক নারীরা গ্রহণ করেন। বিশেষত গ্রামীণ দরিদ্র নারী। গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের কাছে জর্দা ও গুল অনেকটাই নেশা। 

 

সাভারের কাইচাবাড়ি এলাকায় অধিবাসী বিথী আলম বলেন, ছোট্টবেলা থেইক্যা গুল খাই। এইটা আমার অভ্যাস। তাই ছাড়তে পারি না। আমার মা-খালারা সবাই খায়।

 

এর খারাপ দিক সম্পর্কে জানেন না বিথী। অথচ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের ক্যান্সার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৩০ শতাংশের চর্বণযোগ্য তামাক সেবনে অভ্যস্ত থাকে।

 

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেলের (টিসিআরসি) সর্বশেষ গবেষণায় দেখা যায়, ২৭৫ ব্র্যান্ডের ৮৩২ ধরনের ৩ হাজার ২৬৩টি জর্দার কৌটার নমুনার মধ্যে ২৫ শতাংশে কোনো সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। অথচ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী তা থাকা বাধ্যতামূলক।