আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস : প্লাস্টিকে সয়লাব পৃথিবী
অজন্তা ইলোরা
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ০২:১০ এএম, ৫ জুন ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ১২:২৭ পিএম, ৬ জুন ২০১৮ বুধবার
আজ ৫ জুন মঙ্গলবার বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও দিবসটি পালনের জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘আসুন প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি, প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার করি, না পারলে বর্জন করি’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ বাণী দিয়েছেন।
প্লাস্টিকের প্রতি আমাদের আকর্ষণ নিরন্তর। কেনা, ব্যবহার করা, ফেলে দেওয়া, আবার কেনা প্লাস্টিক বোতলে ভরা আমাদের সুস্বাদু পানীয়, প্লাস্টিকে মোড়া আমাদের খাদ্য, ফাস্ট ফুড পরিবেশিত পলিস্টিরিন কন্টেনারে, সঙ্গে প্লাস্টিকের কাঁটা চামচ-প্লেট। ধোয়ামোছার বালাই নেই, ফেলে দিয়ে ভুলে গেলেই হল। সত্যি যদি তাই হত, আজ প্লাস্টিক-মুক্ত পৃথিবী থিমের ওপর ভর করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করার।
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে যেখানে দিনে ৬৫০০ টন প্লাস্টিক ব্যবহৃত হতো, সেখানে ২০১৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৭,০০০ টনে। এ হার চলতে থাকলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার দাঁড়াবে প্রতিদিন ৫০,০০০ টন।
বিশ্বে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয়, তার শতকরা প্রায় ১০ ভাগ প্লাস্টিক। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৫শ’ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে পতিত হয়। এর ফলে এক মিলিয়ন সমুদ্রচারী পাখি এবং এক লাখ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীর মৃত্যু হয়।
প্লাস্টিকের অত্যধিক উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে উর্বর কৃষি জমি থেকে শুরু করে খাল-বিল, নদ-নদী এবং সাগর-মহাসাগরের প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়ন একান্ত প্রয়োজন।
প্রশান্ত মহাসাগরে একাংশে ভাসমান প্লাস্টিকের তাল এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যে তা আকারে মায়ানমার বা ফ্রান্সের মত দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে অনায়াসে। এবং এতেই শেষ নয়, প্রতি মিনিটে এই ভাসমান প্লাস্টিক শহরে যোগ হচ্ছে অন্তত এক লরিভর্তি প্লাস্টিক। এমনকি উত্তর মেরুও সুরক্ষিত নয়। রেকর্ড পরিমান প্লাস্টিক পাওয়া গেছে সেখানেও।
পৃথিবীর সমস্ত প্লাস্টিক অবশ্যই স্থলে উৎপাদিত, এবং সমুদ্রে যত পরিমাণ প্লাস্টিক আজ ভাসছে, তার দশ ভাগের নয় ভাগই সেখানে গিয়ে পৌঁছেছে দশটি নদীর মাধ্যমে, যাদের মধ্যে আটটিই এশিয়াতে অবস্থিত, এবং এদের মধ্যেও প্রধান হল গঙ্গা, ইয়াংতজে, ইয়েলো, পার্ল, এবং মেকং নদী।
সম্প্রতি, নরওয়ের উপকূলে একটি কারভার্স বিক্ড হোয়েল পাওয়া যায়, যার পেটের ভেতর ছিল ৩০ টি প্লাস্টিকের ব্যাগ। একইভাবে, স্পেনের সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি স্পার্ম হোয়েলের পেট থেকে বেরোয় ২৯ কিলো প্লাস্টিক। আলব্যাট্রস পাখিরা রঙচঙে প্লাস্টিক দেখে খাদ্য ভেবে তাদের শাবকদের মুখে বিভ্রান্ত হয়ে তুলে দিচ্ছে বোতলের ছিপি, যার অবধারিত ফল অবরুদ্ধ অন্ত্র, এবং ধীরগতির, অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।
প্রাণীজগতে প্লাস্টিকের এই দাপট মানুষকে স্পর্শ করবে না ভাবছেন? ভুল ভাবছেন তবে। খুব শিগগির এমন দিন আসতেই পারে, যে মাছ আপনার রান্নাঘর হয়ে আপনার খাওয়ার টেবিলে পৌঁছল, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্লাস্টিক।
তবে সব অন্ধকার হয়ে যায়নি এখনও। কিছু দেশ যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। কেনিয়াতে প্লাস্টিক ব্যাগ সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ, গ্রেট ব্রিটেনের বড় বড় সুপারমার্কেটগুলি প্রতিজ্ঞাবোধ হয়েছে যে তারা প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাবে। এবং গতমাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এমন বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক পণ্য বর্জন করার, যেগুলির কম হানিকারক বিকল্প রয়েছে।
এত কিছুর পরও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে চলেছে। পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন, পরিবহণ, মজুত ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অধিকতর সংশোধন করা হয়েছে।
পলিথিনের বিকল্প পাটের শপিং ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন, ২০১০ ও পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক বিধিমালা, ২০১৩ অনুসারে ১৭টি পণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহণে পলিথিনের পরিবর্তে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে যাতে প্রতিবেশ ও পরিবেশসম্মত বিধিব্যবস্থা পালন করা হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। শিল্পাঞ্চল, আবাসিক অঞ্চলসহ যে কোন স্থাপনায় বৃষ্টির পানি ও জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃক্ষ রোপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের সরকার নদী খনন, খাল খননসহ পাড়ে বৃক্ষরোপন বাধ্যতামূলক করেছে। সাগর ও উপকূল অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী, বৃক্ষরোপন ও ম্যানগ্রোভ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
