ভাষা সৈনিক নিবেদিতা নাগ
প্রকাশিত : ০৭:৫১ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার | আপডেট: ০৭:৫১ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার
উইমেননিউজ ডেস্ক,
ঢাকা : নিবেদিতা নাগ ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক। আজ এই মহীয়সী নারীকে নিয়েই আমার এই লেখা।
১৯১৮ সালের ৪ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে নিবেদিতা নাগের জন্মগ্রহন করেন। নিবেদিতা নাগের বাবা অধ্যাপক সঞ্জীব কুমার চৌধুরী ছিলেন বিপ্লবী সূর্য সেনের সহপাঠী; তিনিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ে।মা অমিয়াবালা চৌধুরী ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা।
মহীয়সী এই নারীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিলো চট্টগ্রামে। যেহেতু তিনি বেড়ে উথেছিলেন এক বিপ্লবী পরিবেশে।তাই স্কুলে থাকতেই তিনি বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য চাঁদা তুলতেন, গোপন চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন, এমনকি বাড়িতে বিপ্লবীদের অস্ত্রও লুকিয়ে রাখতেন।স্কুলছাত্রী নিবেদিতাকে বিপজ্জনক মনে হওয়াতে দু’বছরের জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার করা হয়, যে কারণে নারায়ণগঞ্জে মায়ের পৈত্রিক বাড়িতে থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৩৪ সালে। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন। সংগঠনের ডাকে ধর্মঘট সংঘটিত করতে গিয়ে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৩৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অসুস্থতার জন্য এক বছর পরীক্ষা দিতে পারেননি। ১৯৪১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন, যিনি পরবর্তী জীবনে তাঁকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন।কমরেড নিবেদিতা নাগ ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।১৯৪৩ সালে ঢাকা জেলা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবাধীন নারী সংগঠনে কাজ করতে গিয়ে তিনি সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছেন আশালতা সেন, লীলা রায়, মণিকুন্তলা সেন ও সুফিয়া কামালের মতো বরেণ্য নেত্রীদের। পার্টির কাজে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন যুঁইফুল রায়, অনিমা সিংহ, কনক মুখোপাধ্যায়, নিরুপমা গুপ্ত, অমিয়া দত্ত, হেলেনা বসু, নীলিমা বসু, শান্তি দত্ত, ডলি বসু, পঙ্কজ আচার্য প্রমুখ কমিউনিস্ট নেত্রীদের।
৯৪৩-এর ১৭ মে কমরেড নেপাল নাগকে তিনি বিয়ে করেন পরিবারের অমতে। ততদিনে তিনি স্থির করেছেন বাকি জীবন পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করবেন। নেপাল নাগ তখন ঢাকার কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক আন্দোলনের পুরোগামী নেতা হিসেবে পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জন পার্টির সর্বক্ষণিক কর্মী হওয়ার কারণে চরম আর্থিক অনটনে তাঁদের দিন কেটেছে। শৈশবে ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খেতে দিতে পারেননি, কিন্তু পার্টির কাজ এবং কমরেডদের অফুরন্ত ভালবাসা তাঁদের সেই অভাব পূরণ করেছে। তিনি সব সময় বলেন চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির কমিউন জীবন ও কমরেডদের সান্নিধ্য তাঁর অভিজ্ঞতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
১৯৪৮ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে এর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। গোপন কমিউনে হাতে লিখে স্টেনসিল কেটে সাইক্লোস্টাইলে ইশতেহার ছেপে বিলি করেছেন, রাতের অন্ধকারে দেয়ালে পোস্টার লাগিয়েছেন; অমানুষিক পরিশ্রমে শরীর বার বার বিদ্রোহ করেছে কিন্তু কাজ থেমে থাকেনি।১৯৪৯ সালে জেলে গিয়েছেন, পার্টির নির্দেশে বন্দি নির্যাতনের প্রতিবাদে কারাগারের ভেতর অনশন করতে গিয়ে নিজেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারপরও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি।এরপর সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলনে। অনাহারে, অপুষ্টিতে সন্তানের যত্ন নিতে পারেননি, তবু সরে আসেননি আন্দোলনের পথ থেকে। পাকিস্তানি পুলিশের বুটের আঘাত সহ্য করেছেন, নাম বদলে বোরখা পরে সীমান্ত পেরিয়ে এ পারে চলে এসেছেন। পুলিশের ভয়ে দিনের পর দিন কেটেছে গা ঢাকা দিয়ে। শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন তাঁর অনুজপ্রতিম সহযোদ্ধা। ভাষা আন্দোলনের সময় একই কমিউনে ছিলেন তাঁরা। ভারতে অবস্থানের কারনে যদিও তিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেন নি; তারপরেও মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তাঁর বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম আশ্রয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে নাগ দম্পতির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার নেপাল নাগ ও নিবেদিতা নাগকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করে। ২১.০২.২০১৫