ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১২:০৩:১০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দেশে কমছে না মাতৃমৃত্যুর হার ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত : ১১:৪১ এএম, ৩ অক্টোবর ২০১৩ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৬:১৬ এএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৩ সোমবার

MDG_dhaka medicalরাতুল মাঝি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম ঢাকা : দেশে এখনও নিশ্চিত হয়নি নিরপাদ মাতৃত্ব। মা হতে গিয়ে দেশে প্রতি ২০ মিনিটে মারা যাচ্ছেন একজন মা। এখনও প্রতি বছর ২৩ হাজার মায়ের মৃত্যু হচ্ছে সন্তান জন্মের সময়। প্রসবজনিত জটিলতায় বছরে মারা যাচ্ছে ৬ লাখ মা। এ অবস্থায় ২০১৫ সালের মধ্যে সহস্রান্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে সরকারের কাছে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ মাসেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে মাতৃমৃত্যু হার কমবে না এবং নতুন সরকারের কাছে এমডিজি অর্জন আরও কঠিন হয়ে পরবে। এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে তখন এক বছরেরও কম সময় হাতে থাকবে। জানা গেছে, এমডিজি-৫ অনুসারে, দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ কমিয়ে আনতে হবে। ১৯৯০ সালে এক লাখ জীবিত সন্তান জš§ দিতে গিয়ে দেশে ৫৭০ জন মায়ের মৃত্যু হতো। দেশে ২০ বছর আগে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৫ শতাংশ। বর্তমানে এটা ৩.৫-এ নেমে এলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ। সহস্রান্ধ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০১৫ সালের মধ্যে এই অবস্থা ১.৪৩ শতাংশে কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজন মায়ের স্বাস্থ্যর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। গাইনিকোলজিষ্ট অধ্যাপক সায়েবা খাতুন বলেন, চিকিৎসা সেবা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সমাজ ও পরিবারের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় মাতৃস্বাস্থ্য হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান ধারণ, গর্ভপূর্ব ও গর্ভকালিন এবং গর্ভ পরবর্তী সময়ে জরুরি প্রসূতি চিকিৎসার অভাবেও এই মাতৃমৃত্যু ঘটছে। তাই এই মাতৃমৃত্যু রোধ করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। তিনি জানান, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে ২৯ শতাংশ, অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে ২৭ শতাংশ, দীর্ঘ সময় ধরে প্রসব ব্যাথায় ১৬ শতাংশ, অতিরিক্ত জ্বরে ৫ শতাংশ, জন্ডিসে ৩ শতাংশ, অন্যান্য কারণে ৩ শতাংশ মা প্রসবকালীন অবস্থায় মারা যান। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থ’ার মতে, নিরাপদ মাতৃত্ব ব্যবস্থার অভাবে বাংলাদেশে প্রতি ঘন্টায় প্রসবকালীন অবস্থায় মারা যান তিনজন মা। সচেতনতা ও পুষ্টির অভাবে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন। ইউনিসেফের তথ্য মতে, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে হতাশাজনক। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা যায়, দেশে নারীদের দীর্ঘ মেয়াদী অপুষ্টির হার শতকরা ৩৭ দশমিক ৯। এছাড়া ৮৭ শতাংশ মায়ের স্বাস্থ্যকর্মী বা দক্ষ ধাত্রী ছাড়া ও ৯২ শতাংশ মায়ের বাড়িতে প্রসব করানো হয়। খাবারের অপ্রতুলতা ও অপুষ্টি এবং সচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত ঘটছে মাতৃমৃত্যু। অপুষ্টিজনিত মাতৃমৃত্যুর ২৫ ভাগই ঘটে রক্তক্ষরণ ও রক্তস্বল্পতার জন্য, যার একটি কারণ কিশোরী মাতৃত্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাজেটে বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সেবায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সেবাগুলো নিশ্চিত না করা হয় তাহলে ২০১৫ সাল নাগাদ মাতৃমৃত্যুহার দাঁড়াবে ৩১০ এ। তাদের মতে, দেশের বড় বড় শহরগুলোতে সম্প্রতি অনেক বিলাসবহুল এবং অভিজাত প্রাইভেট হাসপাতাল হওয়ায় যেখানে শুধুমাত্র ধনী এবং অভিজাত শ্রেণীর লোকজন স্বাস্থ’্যসেবা নিতে পারছে। কিন্তু দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী উন্নত মানের সেবা থেকে এখনও অনেক দূরে। ইউনিসেফ, হু, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে একটি বেডের জন্য ২ হাজার ৭৩৬ জন রোগী এবং ৩ হাজার ৩১৭ জন রোগীর জন্য একজন ডাক্তার আছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ৫০ শতাংশ ডাক্তারের পদই শূন্য। শুধু তাই নয়, এই গ্রামীণ স্বাস্থ্য  কমপ্লেক্সে ৪০ শতাংশ ডাক্তার এবং ৫৫ শতাংশ নার্সই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়মিত যান না। তারা বেশিরভাগই শহরাঞ্চলের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকতে চান। এতে গ্রামের জনগণ ন্যুনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া ধাত্রীদের (টিবিএ) দক্ষ করতে সরকারি এবং বেসরকারি প্রোগ্রামগুলো প্রায় এক দশক ধরে থেমে আছে। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে এবং মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের জন্য মহিলা মন্ত্রনালয়কে আন্ত:মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিতে বিশেষ দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় বাজেট দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘প্রসুতি মায়েদের রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হেলথ এডুকেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। মা ও পরিবারের সদস্যদের সচেতন করার প্রয়োজনে বয়োসন্ধিকালীন ও প্রজনন শিক্ষা কার্যক্রম স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। প্রতিটি মাতৃমৃত্যুর জন্য সকল পর্যায়ে জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও করা দরকার। সহস্রান্ধ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা ২০১৫ সালে শেষ হতে বাকি মাত্র দেড় বছর। এই অল্প সময়ে সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা কতটুকু সফল হবো তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’ এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, মাতৃমৃত্যুর বিষয়েটিকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রনালয় এক সঙ্গে কাজ করছে। আমরা মাতৃত্বকালীন ভাতা দিচ্ছি। ইতমধ্যে এই ভাতার পরিমান বাড়ানো হয়েছে। ৯ লাখ ২০ হাজার মা বর্তমানে এই ভাতা পাচ্ছে। তিনি বলেন, মেয়েদের সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতবারে মতো এবারের বাজেটেও ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া মায়ের মৃত্যুর হার কমানো ও  পুষ্টি বিষয়েরও ইতিবাচক কিছু কাজ করা হচ্ছে। ও মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আমরা সর্বাতœক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছি। যে করেই হোক প্রসবজনিত মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা হবে এবং আমরা এমডিজির লক্ষ্যমাত্র অর্জনে সফল হবে। ৭ অক্টোবর’২০১৩