নারীর অধিকার আন্দোলনের সূচনা ভাষা সংগ্রাম থেকে
প্রকাশিত : ০৯:০৮ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার | আপডেট: ০৯:০৮ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার
ফরিদা ইয়াসমিন : ভাষা আন্দোলনে রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। এ আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, আন্দোলনের ইতিহাসে তাদের কথা তেমনভাবে স্থান পায়নি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভাষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিলে নারী সমাজ সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি নিজেদের অধিকারের কথাও বলতে শুরু করে। বলা যায়, ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি নারী আন্দোলনও নতুন মাত্রা পেতে থাকে। এ আন্দোলনকে ঘিরে নারীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়। নারী তার মৌলিক অধিকারের ব্যাপারেও সচেষ্ট হয়। সে সময় নারীদের জন্য বেশ কিছু কল্যাণমুখী পদক্ষেপও গৃহীত হয়। তাই ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি নারী তার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতেও শেখে। নারী আন্দোলন বেগবান হয় তখন থেকেই।প্রথম থেকেই ভাষা আন্দোলনের মূল সে াতধারায় পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেন। পরে তকদীর পত্রিকায় তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার ভাষা সমস্যা’ নামে আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন। এতে তিনি লেখেন বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যখন বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা দাবি করে প্রবন্ধ লেখেন তখনই বিষয়টি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত বলা যায়। তবে তারও আগে যশোরের জনৈক হামিদা রহমান কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক একটি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি লেখেন- ‘পাকিস্তান জনগণের রাষ্ট্র। তাই তার ভাষা হবে জনগণের ভাষা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাড়ে চার কোটি লোক যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করে, যে ভাষায় মনের ভাব ব্যক্ত করে, সেই মাতৃভাষা তাদের নিজস্ব ভাষা হবে না এও বিশ্বাস করতে হবে?’ হামিদা রহমানের এই চিঠিটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই। এর আগে আজাদ পত্রিকায় বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। তার প্রতিবাদ করেই চিঠি লিখেছিলেন হামিদা রহমান। এই হামিদা রহমান পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে বেশ কয়েকজন নারী স্বাক্ষর করেন। তারা হলেন- অধ্যাপিকা শামসুন নাহার মাহমুদ, লীলা রায়, মিসেস আনওয়ারা চৌধুরী। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে নারীরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রওশন আরা বাচ্চু, হালিমা খাতুন, শাফিয়া খাতুন, সোফিয়া ইব্রাহীম প্রমুখ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে যোগ দিয়ে এগিয়ে গেছেন। সে সময় মেয়েদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ হয়েছিল। অনেকে আহত হয়েছেন। গ্রেফতার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ মর্গ্যান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম। এমন একটা সময় নারীরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাও ছিল নিষিদ্ধ। প্রক্টরের অনুমতি নিয়ে কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলতে হতো। অনুমতি ছাড়া কথা বললে ১০ টাকা জরিমানা হতো। সেই পিছিয়ে থাকা কঠিন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বাধাবিপত্তি এবং সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্রীরা ভাষার সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ছাত্রীরা যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তাকে কোনো অবস্থাতেই খাটো করে দেখার উপায় নেই বরং তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
লেখক : সাংবাদিক
২১.০২.২০১৫
