ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ১০:২০:৩৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

নারী আন্দোলনের পথচলা মসৃণ নয়

প্রকাশিত : ০৬:৩৯ এএম, ৮ মার্চ ২০১৫ রবিবার | আপডেট: ০৬:৩৯ এএম, ৮ মার্চ ২০১৫ রবিবার

মালেকা বানু : ৮ মার্চ নারী আন্দোলনকারীদের জন্য একটি প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশের দিন। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনও ৮ মার্চ প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির দোলাচলে থাকে। যতই দিন যাচ্ছে, নারীর ভূমিকার কারণে ৮ মার্চ নারী আন্দোলনের জন্য উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা নানাভাবেই জাতীয় উন্নয়নের মূলস্রোতধারা নিজেদের সম্পৃক্ত করে চলেছে, জাতীয় অর্থনীতিতে অভাবনীয় অবদান রাখছে, দেশের রাজনৈতিক সামাজিক প্রক্রিয়ায় দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছে। সামাজিক উন্নয়ন সূচকেও দেশকে অগ্রসর করে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরই কিছু না কিছু প্রাপ্তি যোগ হচ্ছে। নিশাত ও ওয়াসফিয়ারা এভারেস্টের চূড়ায় নিজেদের নয়, নারী সমাজকে তুলে ধরছে, ছত্রীসেনা জান্নাতুল ফেরদৌস নারী সমাজের সাহসের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, সবক্ষেত্রে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যোগ না ঘটায় অগ্রযাত্রার এই গতি কখনও ধীর, কখনও স্থবির, কখনও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নারী আন্দোলন বিচলিত বোধ করে। যদিও ইতিহাস বলে নারী আন্দোলন এমনই এক চলমান প্রক্রিয়া, যার পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির ঘোষণা ছিল এ দেশের নারী আন্দোলনের জন্য অনেক বড় একটি প্রাপ্তি। এই প্রাপ্তি ধরে রাখা যায়নি। এই নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। '৯৭-এর নারী উন্নয়ন নীতির দাবিতে নারী আন্দোলন অটল ছিল। ২০১১-এর ৮ মার্চ নারী সমাজের আকাঙ্ক্ষিত যে নারীনীতি ঘোষণা করা হয়, সেই নীতিটিও নারী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে শুধু যে সঙ্গতিপূর্ণ তা নয়, পরে সেই নারীনীতিতেও একটি পাদটীকা- 'এই নীতিতে যা-ই থাক না কেন, আইন প্রণয়নকালে, কোরআন-সুন্নাহ বিধানের পরিপন্থী কিছু থাকলে তা অকার্যকর বলে গণ্য হবে' যুক্ত করা হয়, যা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মূল চেতনাকে বিনষ্ট করেছে। নারী আন্দোলনকে আহত করেছে। বাংলাদেশ নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আর নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্মূলের আন্দোলন অবিভাজ্যভাবে এগিয়ে চলছে। নারী আন্দোলন নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলেও, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা এখন পর্যন্তও অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে বিরাজ করছে শুধু না, সহিংসতার মাত্রা এবং ধরন সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। আজ প্রকাশ্য ধর্ষণ, দলগত ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, পর্নোগ্রাফির মতো যে ধরনের সহিংসতার শিকার নারী হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নারীকে আজ শুধু যে ভোগ্যপণ্য আর যৌনতার প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে তা নয়, সেখানে পুরুষতন্ত্রের শক্তি প্রদর্শন, দাম্ভিকতা দেখানো, রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাতে, নারীর সতীত্ব নষ্ট করার মতো মনোভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই মহা উৎকর্ষের যুগেও নারীর প্রতি সহিংসতার সেই আদিম প্রবৃত্তি থেকে কেন মানবসমাজ বের হয়ে আসতে পারছে না, সেটা নারী আন্দোলনের কাছে অনেক বড় জিজ্ঞাসা। নারী আন্দোলন একই সঙ্গে এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজছে, মানবতার লাঞ্ছনার প্রতিরোধের জন্য নতুন পথের সন্ধান করছে। নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলের যে আহ্বান আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিধ্বনিত হয়েছে, তা নির্মূল করতে নতুন এক সামাজিক শক্তির অভ্যুদয়ের প্রয়োজন। আজকের বিশেষত তরুণ সমাজকে পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করবে। পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ করবে, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। নারী পুরুষের সমান অধিকার ও ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ নতুন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে-এটাই প্রত্যাশা। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ০৮.০৩.২০১৫