ঢাকা, বুধবার ০৪, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৮:৫৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

চলে গেলেন বীরাঙ্গনা হাসিনা বানু 

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৫৩ পিএম, ১৩ মার্চ ২০২৪ বুধবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

জন্ম সনদ ও এনআইডি না থাকায় শেষ পর্যন্ত কোন প্রকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়াই চির বিদায় নিলেন পথে পথে ঘুরে বেড়া সেই চেনা-জানা ও প্রিয় মুখ বীরাঙ্গনা হাসিনা বানু ওরফে ইদু মাস্টারনি (৮৭)।

মানসিক ভারসাম্যহীন এই মানুষটিকে চেনে না দিনাজপুর শহরে এমন মানুষ মেলাভার। কিন্তু মৃত্যুতেও মিললোনা রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি। 

দিনাজপুর শহরের পাক পাহাড়পুর মহল্লার ভাগিনা মনোয়ার আলী মানুর বাসায় দীর্ঘ এক মাস বিছানায় শয্যাশায়ী থাকার পরম   মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 


১২  মার্চ (মঙ্গলবার) বাদ আছর নামাজে জানাযা শেষে শেখ ফরিদপুর গোরস্থানে মরহুমার দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়। 

একমাত্র ছেলে মাহাবুব আলী  স্বপন (৬৩)  ঢাকা থেকে আসতে না পারার কারণে জানাযা নামাজ ও দাফন কার্য্যে অংশগ্রহন করতে পারেননি। তিনি মোবাইল ফোনে জানান,তার মা বেঁচে থাকা অবস্থায় ২০২২ সালে সদর উপজেলায় একটি বাড়ীর জন্য আবেদন করেছিলেন । কিন্তু  কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। অবহেলায় অযত্নে তার মা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।

একাত্তরে সর্বস্ব হারানো এই শিক্ষিকা সবার কাছে ইদু মাস্টারনি বলে পরিচিত। তার পুরো নাম হাসিনা বানু।  

হাসিনা বানুর ভাগিনা মনোয়ার আলী মানু বলেন, তৎকালীন মুন্সিপাড়ায় আমার খালা বসবাস করতেন। ইদু মাস্টারনি যেন একাত্তরের বিভীষিকাকে বুকে নিয়েই সদর হাসপাতালের সামনে রোজ যেতেন। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লিলি মোড়ে বসে থাকতেন। বাড়ি ফেরার পথে শহরের পাক পাহাড়পুরে শান্তির চা দোকানের পাশে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বসে থাকতেন।

তিনি বেশিরভাগ সময়ই একা একা কখনো বাংলায় আবার কখনও ইংরেজিতে কী যেন বিড়বিড় করে বলতেই থাকেন। তবে কথা বললে তিনি একটি কথা স্পষ্টভাবেই বলেতেন - ‘আমার নামে আপনারা একটা দরখাস্তলিখে দিবেন তো?’।

ইদু মাস্টারনি বা হাসিনা বানু একজন শিক্ষিত নারী। তিনি স্বাধীনতার আগে চাকরি করতেন বাংলা স্কুলে (তৎকালীন কিন্ডার গার্টেন)। সেখানে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে হাসিনা বানু দিনাজপুর সদর হাসপাতালে নার্স হিসেবে সেবা দিতেন। এ সময়ই তার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ইদু মাস্টারনি ১৯৭১ সালে হারান তার দুই সন্তান স্বপন (১১) এবং কুপনকে (৮)।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের কোনো এক দিনে বিহারি রজাকাররা ইদু মাস্টারনিকে ধরে নিয়ে যায় খান সেনাদের কাছে। সময়টি ছিল দিনাজপুরের যুদ্ধকালীন ইতিহাসের চরমতম সময়। সবেমাত্র দিনাজপুরকে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, ফলে পাকিস্তানি হায়েনারা ছিল হায়েনার চেয়েও হিংস্র এবং নিষ্ঠুর। দিনাজপুরে চলে এলাপাতাড়ি হত্যা-নির্যাতন এবং পাশবিক উল্লাস।

সেদিন ধরে আনা ইদু মাস্টারনির সঙ্গেই ছিল তার দুই শিশু সন্তান স্বপন (১১) ও কুপন (৮)। শিক্ষিত নারী হয়ে তিনি স্কুলে এবং পরে হাসপাতালে চাকরি করতেন এটাই ছিল তার অপরাধ। এছাড়া বাসায় বাসায় গিয়ে তিনি টিউশনিও করাতেন। সে সময় বাচ্চা দুটি বাধার কারণ হওয়ায় খান সেনারা তাদেরকে জোর করে ইদু মাস্টারনির বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তার চোখের সামনেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কয়েক টুকরা করে ফেলে।

ইদু মাস্টারনি তার সন্তানদের বাঁচাতে এগিয়ে এলে খান সেনারা তাকেও রাইফেলের বায়োনেট ও বাট দিয়ে মাথাসহ সমস্ত শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এক সময় পাকিন্তানি হায়েনারা ইদু মাস্টারনিকে মৃত ভেবে ট্রাকে করে দিনাজপুরের বধ্যভূমি কাঞ্চন নদীর পাড়ে ফেলে দেয়।

কিন্তু জ্ঞান ফিরে অনেকটা বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত শরীর নিয়েই ইদু মাস্টারনি হামাগুড়ি দিয়ে শেষরাতের দিকে তার পাহাড়পুরের বাসায় পৌঁছে গোঙ্গাতে থাকেন। এ সময় তার বোন তাকে ঘরে নিয়ে শরীরের জমাটবাঁধা রক্ত, বালু ও কাদা পরিষ্কার করে তাকে অতি গোপনে পশ্চিমবঙ্গের বালুরঘাট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করায়। হাসপাতালে ভর্তির পর ইদু মাস্টারনির খোঁজ আর কেউ রাখেনি। পরিবারের লোকজন ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

সে সময় তার স্বামী বড় সন্তান তপনকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। পরে তিনি ফিরে এলেও ছেলে তপনের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
স্বাধীনতার পর ইদু মাস্টারনি দেশে ফেরেন। এরপর তার কোলজুড়ে আসে চতুর্থ সন্তান মাহাবুব আলী। দীর্ঘ জীবনে অনেকটা সংগ্রাম করেই বেঁচে ছিলেন এ মহিয়সী শিক্ষক। পাকিস্তাানি সেনাদের নির্যাতনেও সেদিন হাসিনা বানু ওরফে ইদু মাস্টারনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন সত্য, কিন্তু তিনি মৃত্যু অবধি কোনো ভাতা কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা পাননি।

স্বামী এবং সন্তানের খোঁজ
দিনাজপুর শহরের পাক পাহাড়পুর মহল্লার মরহুম মো. লালুর স্ত্রী বীরঙ্গনা হাসিনা বানু ওরফে ইদু মাস্টারনি। স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। কোথায় আছেন কেউ জানে না। আর বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান মাহাবুব আলী ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

জীবদশায় দেয়া হাসিনা বানু ওরফে ইদু মাস্টারনির বক্তব্য
৭১’র মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের কারণে অনেকটাই মানসিক ভারসাম্যহীন তিনি। অনেক কথাই তার মনে নেই। কথা বলতে গেলে থেমে যান। যা বলেন তার অধিকাংশেরই সত্যতা মেলেনি।

তিনি বলেন, আমার তিন ছেলে আর এক মেয়ে ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই ছেলে আর মেয়েকে মেরে ফেলেছে। সেই সময় চাকরি করতাম বাংলা স্কুলে (তৎকালীন কিন্ডার গার্টেন)। ওই স্কুলে সাত বছর থেকে অবসরে গেছি। সেই সময় ক্লাস নিতাম ১ম থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত। দুই শিফটে ক্লাস হতো। সকাল ৭টা থেকে ১০টা একটা এবং সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটা। আমি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। বেতন পেতাম ৭০ টাকা। আর যারা বি.কম পাস ছিল, তারা বেতন পেত ১১০ টাকা। পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্কুলটা বন্ধ হয়ে যায়।