পুরুষ নয়,মানুষ চাই
প্রকাশিত : ১১:২৫ এএম, ২০ এপ্রিল ২০১৫ সোমবার | আপডেট: ১১:২৬ এএম, ২০ এপ্রিল ২০১৫ সোমবার
পারভীন সুলতানা ঝুমা : পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে জঘন্য ঘটনাটি ঘটল তা নিয়ে দেশের মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। আমাদের চোখ ভিজে আসে। আমাদের এ কান্না প্রতিবাদের। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেই ‘ছেলেদের’ সামনাসামনি দেখতে চাই। সামনে গিয়ে তাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাই। আপাদমস্তক, তাদের শরীর, তাদের হাত-পা-মাথা দেখতে চাই। আমি প্রাণিবিজ্ঞানী নই, এরপরও তাদের দেখে বুঝতে চেষ্টা করব তারা কোন শ্রেণির জানোয়ার। কোন প্রজাতির জন্তুর আওতায় পড়ে তারা। এরপর জানার চেষ্টা করব তাদের মা-বাবাকে; কারা তাদের গর্ভধারিণী মা, কোন ঔরসে তাদের জন্ম। কোন বলয়ে কোন পরিবেশে তারা ‘মানুষ’ হয়ে উঠেছে। মনুষ্যত্বের ঘাটতির কারণ কী? তাদের চারপাশ কতটা অস্বাস্থ্যকর, বিবেকহীন ও বিকৃত ছিল? তারা কি শিশুকাল থেকেই পরিবারের পুরুষ সদস্য কর্তৃক নারীদের এমন অপমানিত, লাঞ্ছিত আর তাচ্ছিল্য করতে দেখে এসেছে? আমি দেখতে চাই এসব ছেলের শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীদের।
তারা তাদের ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কি কোনো মানবতার শিক্ষা দিতে পারেনি? কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা অধ্যয়ন করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানটি কোথায়। যত প্রশ্নই করি, তাদের মা-বাবা, স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী সবাই তো বাংলাদেশেরই নিঃসন্দেহে। তারা তো সেই পাঠ্যপুস্তক পড়েছে, যেখানে নারীদের শ্রদ্ধা আর সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তেমন কোনো কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। আমি দেখতে চাই সেই পুলিশ সদস্যদের, যাদেররা ডিউটি এলাকাতে নারীরা লাঞ্ছিত হলেও ‘কিছু যায় আসে না’ গোছের ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি দেখতে চাই থানার সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের, যারা সেই ‘ছেলেদের’ নির্দ্বিধায় ছেড়ে দিয়েছে। বইমেলার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরেই যখন অভিজিত্ খুন হয় তখনও পুলিশ সদস্যরা নির্লিপ্ত ছিল। দুই ঘটনায় তাদের আচরণের সাদৃশ্যও সমীকরণ করতে চাই না। গতানুগতিক আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পুলিশ বাহিনীর জন্য যতই প্রশিক্ষণ আর কর্মশালার আয়োজন করা হোক না কেন, যাদের লেজ সোজা হওয়ার নয় তা ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে। দলীয়করণ এত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠে কোনো কোনো পর্যায়ে তখন দায়িত্ববোধ যোজন দূরে তো চলেই যায়, বিবেকও যেন হারিয়ে যায়। আমি দেখতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রক্টর স্যারকে। এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও তার শান্ত মূর্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে। বলিহারি তার নার্ভ। তিনি কম্পিউটারে গেম খেলছিলেন, এলাকার মেয়েদের আর্তচিত্কার কীভাবে তার কর্ণে পৌঁছবে। তবুও ভালো তিনি ‘ভুভুজেলা’ বাজাচ্ছিলেন না। যারা মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল তাদের কাছে এবার এই ভুভুজেলা নতুন উপদ্রব মনে হয়েছিল, কিন্তু এই সদ্য আবিষ্কৃত ও গণব্যবহূত বাদ্যযন্ত্রটি সেই বর্বররা এভাবে নিজেদের বর্বরতা ঢাকতে ব্যবহার করবে তা কে বুঝতে পেরেছিল।
এ ঘটনার পর মহিলা পরিষদ, সম্মিলিত নারী সমাজের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখলাম। দেখলাম না কোনো পেশাজীবী রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদ। এর কি ভেবেছে, প্রতিবাদ জানালে হয়তো ‘ধর্মীয় অনুভূতি’তে আঘাত দেওয়া হবে। কারণ কিছুদিন আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পয়লা বৈশাখ পালন করা অ-ইসলামিক ইত্যাদি জাতীয় উপদেশ আসছিল। তবে এর চেয়ে বড় কথা, ঘটনাটি নিছক ‘মেয়েদের বিষয়’ মনে করে হয়তো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। পৈতৃক সম্পত্তির সমানাধিকারের বিষয়টি নিয়ে এগতে চান না আমাদের নীতিনির্ধারকরা। এতে নাখোশ হবেন ‘হেফাজত’ জাতীয় সম্প্রদায়। এ ধরনের গোষ্ঠীতে ভোটার সংখ্যা কি নারীদের চেয়েও বেশি? শুধু বাংলাদেশ কেন, নারী সম্পৃক্ত ঘটনাকে প্রাধান্য তালিকায় আনার ব্যাপারে বিশ্ব কি খুব একটা আন্তরিকতা দেখাতে পারছে? নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম যখন ২৭৫ স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করল বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া যতটা হওয়ার কথা ততটা হয়েছে কি? বরং ইসলামিক চরমপন্থী দুই ভাই কর্তৃক প্যারিসের ব্যঙ্গ পত্রিকা ‘শার্লি হেবদো’ আক্রমণ ঘটনার প্রতিক্রিয়া এরচেয়ে অনেক ব্যাপক ছিল। এ ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো যায় শার্লি হেবদো ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে, সাংবাদিকসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অবশ্যই এটি একটি অযৌক্তিক নৃশংস ঘটনা। এর প্রতিবাদে প্যারিস শহরে বিশ্বনেতৃবৃন্দসহ লাখো মানুষের সমাবেশ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
নাইজেরিয়ার বোকো হারামের মেয়েদের অপহরণের প্রতিবাদে কি ছুটে যেতে পারত না এই নেতৃবৃন্দ। মেনে নিলাম প্রাণহানি না হওয়াতে নাইজেরিয়ার ঘটনা প্রাণসংঘাতময় সন্ত্রাসী হামলার মর্যাদা পায়নি। কিন্তু এই পশ্চিমারাই পাকিস্তানের নারীশিক্ষার জন্য লড়াকু মালালার জন্য কতটা উদ্বিগ্ন তা তো আমরা দেখছি। মালালাকে হত্যা করার জন্যই তালেবানরা তার বাসে উঠে গুলি করে, এ কথা সত্য। সীমান্ত প্রদেশে অতি রক্ষণশীল সমাজে মালালা নারীশিক্ষার জন্য যে সংগ্রাম করেছে এর জন্য অবশ্যই সে স্যালুট পাওয়ার যোগ্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তালেবানদের গুলিতে যদি সত্যি মালালার জীবন যেত তাহলে কি সে ঠিক একইভাবে সম্মানিত হতো? একইভাবে কি পশ্চিমারা তাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হতো? মালালার কৃতিত্ব আর তার প্রতি পশ্চিমাদের উচ্ছ্বাস এ দুটির অনুপাত সমান কি না তা নিয়ে কেউ কেউ ভাবছে, যারা ভাবছে তারা কিন্তু মুসলিম উগ্রপন্থী নয়।
নাইজেরিয়ার সেই ২৭৫ মেয়ের ভাগ্যে কি হয়েছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। গনিমতের মাল বলে নারীদের ভোগ করার যে লাইসেন্স ধর্মে দেওয়া আছে তা ব্যবহার করার কার্পণ্য একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনী করেনি, কোনো ইসলামপন্থী সশস্ত্র বাহিনী করতে পারে না। শুধু ইসলামি জঙ্গিরা নয়, পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে শত্রুপক্ষের নারীদের ওপর নির্যাতন যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তা উত্সাহিত করা হয়। আফ্রিকায় জাতিগত যে সংঘাত চলছে সেখানে বিপক্ষ জাতির নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের কাহিনি শুনলে মানুষমাত্র অসুস্থ হয়ে উঠছে। আমরা অনেকে জানি না বোকো হারামের আওতা থেকে বেশ কয়েকজন মেয়ে পালিয়ে এসেছে। তাদের কেউ কেউ আবার স্কুলে যেতে চায়। কেউ স্বপ্ন দেখে শিক্ষয়িত্রী হওয়ার, কারও স্বপ্ন চিকিত্সক হওয়া। তাদের অবদান কি মালালার চেয়ে কম? কিন্তু তারা কেন পশ্চিমা মিডিয়া বা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নজরে পড়ছে না, সে প্রশ্ন আসতেই পারে।
নাইজেরিয়ার মেয়েগুলোর অপরাধ ছিল তারা স্কুলে যায়। নারীশিক্ষার বিরোধী ইসলামপন্থী জঙ্গিরা। অথচ ইসলামের কোথাও নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে বলা হয়নি। খোদ সৌদি আরবেও মেয়েদের স্কুল-কলেজ রয়েছে। তবে সে শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো গৃহিণী হওয়া ছাড়া আর কিছু নেই। যদি সৌদি নারীরা চাকরি করার সুযোগও পায় তা গতানুগতিক ‘শিক্ষকতা’ ও ‘নার্সিং’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে নারীদের পর্দাপ্রথার কঠোরতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে ২০০২ সালে মেয়েদের একটি প্রাথমিক স্কুলের অগ্নিকাণ্ডে এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে এখনও অনেকের মনে বিদ্যমান। আগুন থেকে বাঁচার জন্য যখন হিজাব ছাড়াই মেয়েরা প্রাণ বাঁচাতে স্কুলে বাইরে ছুটে আসে তখন পাহারাদাররা তাদের আবার সেই জ্বলন্ত স্কুলে ঢুকতে বাধ্য করে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় ১৫ জন ছোট ছোট মেয়ে। এই ঘটনা সারা পৃথিবীতে সমালোচনার ঝড় তুলে। তাতে অবশ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কিছু যায় আসে না। কারণ তাদের আছে ‘তেল’ আর সখা যুক্তরাষ্ট্র। কয়েকদিন আগে সুইডেনের নারীবাদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালসট্রম সৌদি আরবে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নারীদের প্রতি চরম বৈষম্যের প্রচণ্ড সমালোচনা করার পর সৌদি আরব এই নারীকে বয়কট করে। তাকে আরব লিগের সম্মেলনে ভাষণ দিতে দেওয়া হয়নি। যে দেশের প্রধান ইমাম ‘স্বামীরা ক্ষুধা পেলে স্ত্রীকে টুকরো টুকরো করে খাওয়াকে জায়েজ বলে ঘোষণা দেয় সেদেশে নারীরা কী অবস্থায় থাকতে পারে এটি আর বুঝিয়ে বলার অবকাশ নেই। তবে ইমামের এই বয়ান মানলে যেখানে চার স্ত্রী রেখে সুন্নত পালনকারীদের কখনই অভুক্ত থাকার কথা নয়।
আমাদের দেশে নারী লাঞ্ছিত বা নির্যাতিত ঘটনার পর নারীর ওপর দোষ চাপানোর যে চর্চা চালু রয়েছে, গত পয়লা বৈশাখের ঘটনার পর এর ব্যত্যয় ঘটেনি। নারী ধর্ষিত হোক, নির্যাতিত হোক সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহানূভুতি জানিয়ে সর্বশেষে একটা ‘তবে’ যুক্ত করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে রয়েছে। নববর্ষের এ ঘটনার পর মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। পয়লা বৈশাখে মেয়েরা কী অশালীন কাপড় পরে? শাড়ি-চুড়ি পরার মধ্যে কি অশালীনতা থাকতে পারে? বরং আমি বলব রাস্তাঘাটে বাংলাদেশের মেয়েরা অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে শালীনভাবে (মধ্যপ্রাচ্যের বস্তাবন্দি নারীদের কথা বাদ দিয়ে) চলাফেলা করে থাকে। নারীরা কী পরবে আর কী পরবে না তা পুরুষরা ঠিক করবে, নারীরা নয়। এটি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক। কয়েকদিন আগে আমার কন্যাসম একজনের সঙ্গে মৃদু তর্ক হয়েছিল এ বিষয়ে। ফেসবুকে একটি মন্তব্য এসেছিল ‘ডু নট আস্ক ইয়োর ডটার নট টু ওয়্যার মিনি স্কার্ট, আস্ক ইয়োর সান নট টু স্টের’। অর্থাত্ তোমার কন্যাকে মিনি স্কার্ট পরতে নিষেধ করো না বরং তোমার পুত্রকে ওইদিকে তাকাতে নিষেধ করো। যার সঙ্গে তর্ক হচ্ছিল তার বক্তব্য পুত্রকে না তাকানোর সঙ্গে কন্যাকেও মিনি স্কার্ট পরতে বারণ করতে হবে। আমার মতে মেয়েরা যা পরবে তা তাদের ইচ্ছা, যেমন ছেলেরা যা পরবে তা তাদের ইচ্ছা। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে সমস্যা ছেলেদের, মেয়েদের নয়। ছেলেদের নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধান করতে হবে। ধর্ষণ বা উত্ত্যক্ত করে এর সমাধান হবে না। আমার খুশি আমি উলঙ্গ হয়ে চলব, তোমার অস্বস্তি হতে পারে, পাবলিক নুসেন্সের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাকে আটক করতে পারে, কিন্তু এ কারণে আমাকে উত্ত্যক্ত করার অধিকার তোমাকে কেউ দেয়নি।
পয়লা বৈশাখের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর ফেসবুকে নানাজন নানা স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমার মেয়ের স্ট্যাটাস ছিল, ‘হোয়েন উইল দ্য ওয়ার্ল্ড রিয়ালাইজ দ্যাট সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট হেজ গট নার্থিং টু ডু হাউ এ গার্ল ড্রেসড আপ’ অর্থাত্ পৃথিবী কখন বুঝতে পারবে যৌন হয়রানির সঙ্গে মেয়েদের ড্রেসআপের কোনো সম্পর্ক নেই।’ আমার মন্তব্য ছিল ‘যতদিন না পৃথিবী থেকে পুরুষ বিলুপ্ত হয়; আমি মানুষ বোঝাচ্ছি না, পুরুষ বোঝাচ্ছি’। আর সেই সময় যারা মেয়েদের বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল, নিজেদের শার্ট খুলে লাঞ্ছিত মেয়েদের গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল, তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। আমি মানুষ বলতে তাদের কথাই বলছি।
লেখক : সাংবাদিক
২০.০৪.২০১৫ 