নভেরা আহমেদ : এক অভিমানী শিল্পী
প্রকাশিত : ০৫:১৮ এএম, ৭ মে ২০১৫ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৫:১৯ এএম, ৭ মে ২০১৫ বৃহস্পতিবার
পঞ্চম খান, সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম,
ঢাকা : শিল্পী নভেরা আহমেদ আর নেই। তাঁর সারা জীবনের অভিমান দূর আকাশে মিশে গেছে। অবসান হয়েছে তাঁকে নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার। জীবনের সব লেনদেন শেষ করে একবুক অভিমানকে সাথি করে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমাদের অজানাই রয়ে গেলো অনেক কিছু।
নভেরা আহমেদ ১৯৩০ সালে সুন্দরবন জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস চট্টগ্রামে। জীবনে একটি বিরাট সময় তিনি কাটান কুমিল্লা শহরে।
বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত তিনি। বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে তার অবদান অপরিসীম। তিনি ভাস্কর হামিদুর রহমানের সাথে জাতীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করছিলেন। দীর্ঘ অন্তরাল জীবনের পর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি থেকে প্যারিসে তাঁর রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭-এ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক-এ ভূষিত করে। অবশেষে ৬ ই মে প্যারিসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন নভেরা।
জন্ম ও শিক্ষা জীবন : আগেই বলেছি, নভেরা আহমেদের জন্ম সুন্দরবনে, ১৯৩০ সালে। চাচা আদর করে নাম রাখেন নভেরা। ফার্সি শব্দ ‘নভেরা’র অর্থ নবাগত, নতুন জন্ম। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদিঘির উত্তর পাড়। চাকরিসূত্রে পিতা সাইদ আহমেদ পরবর্তীতে কোলকাতায় ছিলেন। নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতায়। নভেরা কলকাতার লরেটা থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ভাস্কর্য গড়তেন।
১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত ভাগ হয়ে যাওয়ার পর তারা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লায় চলে আসেন। এ সময় নভেরা কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। পিতার অবসরগ্রহণের পর তাঁরা সবাই আদি নিবাস চট্টগ্রামে গিয়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন নভেরা।
নভেরা লন্ডনে যান ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। লন্ডনে তখন তাঁর মেজ বোন শরীফা আলম বিবিসির একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন এবং বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন নাজির আহমেদ। নাজির আহমেদের ছোট ভাই হামিদুর রাহমান তখন ঢাকা আর্ট কলেজে পড়ছেন। কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের একজন তিনি। তাঁর সহপাঠী ছিলেন আমিনুল ইসলাম। হামিদ যখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন নাজির আহমেদ তাঁকে নিয়ে গিয়ে প্যারিসের বোজ আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু হামিদ প্যারিসে থাকতে পারেননি। তিনি লন্ডনে ফিরে ভাইয়ের ফ্ল্যাটেই উঠলেন। আর তখনই নভেরার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। লন্ডনে হামিদ সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টে ভর্তি হলেন। এখানে ভর্তি হবার জন্যে আর্টের ওপর প্রাথমিক কিছু জ্ঞানের প্রয়োজন হতো।
নভেরা ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হলেন। ১৯৫১-৫২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইন প্রথম প্রবর্তিত হলো। এ সম্পর্কে প্রসপেক্টাসে বলা ছিল, ‘শিল্পকলার শিক্ষকদের জন্য এটি একটি স্বীকৃত যোগ্যতা হবে।’ কোর্সটি চার বছরের; প্রথম দুবছর পর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা, পরবর্তী দুবছর পর ডিপ্লোমার জন্য ফাইনাল পরীক্ষা। নভেরা ১৯৫৫ সালে কোর্স শেষ করে ডিপ্লোমা পেলেন।
ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন ডক্টর ক্যারেল ভোগেল। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে নভেরার প্রত্যয়নপত্রে অধ্যক্ষ ভোগেল লিখেছেন, ’Her studies from life show a strong sense of observation, and certainly there is originality and depth of thought in her compositions. Her portrait heads are full of life. Though in general working in the European way Miss. Ahmed’s sculptures shows how indelible is the unconscious influence of Eastern monumentality and traditions. The personality developed here will, I am convinced, become a fine artist and inspiring teacher, given the necessary help and opportunity.’
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমান একসঙ্গে ইটালির ফ্লোরেন্সে যান। প্রথমে তাঁরা শিল্পী আমিনুল ইসলামের আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং পরে তিনজন একত্রে একটি স্টুডিওতে উঠে যান। নভেরা মাস দুয়েক শুধু ঘুরে দেখলেন। ডক্টর ফোগেল ভেন্তুরিনো ভেন্তুরির নামে এক ইতালীয় শিল্পীর কাছে নভেরার নাম উল্লেখ করে একটি চিঠি দিয়ে দিয়েছিলেন। এই শিল্পীর সাহচর্যে নভেরা দোনাতেলোসহ প্রাচীন কয়েকজন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দুমাস তাঁর কাছে কাজ শেখেন। ফ্লোরেন্স থেকে ভেনিসে গেলেন নভেরা ও হামিদ এবং সেখান থেকে লন্ডন। '৫৪ সালেই ক্রিসমাসের ছুটিতে নভেরা ও হামিদ প্যারিসে রঁদার মিউজিয়াম দেখতে গিয়েছিলেন। ভাস্কর্যের ছাত্রী স্বভাবতই অত্যন্ত অভিভূত হয়েছিলেন রঁদার কাজ দেখে।
শহীদ মিনারের নকশা ও বিতর্ক : ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে নভেরা ও হামিদ একসঙ্গে দেশে ফিরে এলেন। ঢাকায় তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরিকল্পনায় আধুনিক স্থাপত্য নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়েছে। তাঁরই উদ্যোগে নবনির্মিত পাবলিক লাইব্রেরি, পরবর্তীকালে যেটা ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়েছে সেখানে তাঁরা দুজনেই কাজ করার কমিশন পেলেন। ওপরের একটি দেয়ালজুড়ে বিশাল এক ফ্রেসকো করলেন হামিদ; নভেরা প্রবেশপথের দেয়ালের ওপরের অর্ধেকটা জুড়ে একটি লো রিলিফ করলেন। তারপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁরা আরো কিছু কাজ করলেন এবং ’৫৭ সালে ওই লাইব্রেরিতেই তাঁদের যৌথ প্রদর্শনী হলো। এ সময় একেবারে নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে পরিচিত হলো এদেশের মানুষ।
এসময় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মানে শৈল্পিক কাজের দায়িত্ব পড়ে হামিদুর ও নভেরার ওপর। তাঁরা কাজও শুরু করেন। নারের ৩টি স্তম্ভ, নভেরার ৩টি ভাস্কর্য এবং হামিদুররহমানের ম্যুরাল সম্পন্ন হয়েছিল। ঠিক এ সময় ১৯৫৮ সালের সামরিক আইনজারী হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সময় গড়িয়ে গেলে নভেরা আহমেদের নামটি বাদ পড়ে যায় ইতিহাস থেকে।
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার অনুরোধ করেন প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে। জব্বার সাহেবের অন্যতম সহকর্মী ছিলেন প্রকৌশলী শফিকুল হক। তিনি নভেরার বড় বোন কুমুম হকের স্বামী। শহীদ মিনারের নকশার জন্য কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন হয়নি। জয়নুল আবেদিন সরাসরি হামিদকে বলেছিলেন স্কেচসহ মডেল পেশ করতে। রবিউল হুসাইন ‘ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে স্থাপত্য ভাস্কর্যের সর্বপ্রথম উদাহরণ হচ্ছে শিল্পী হামিদুর রাহমান, ভাস্কর নভেরা আহমেদ এবং স্থপতি জাঁ দেলোরা কর্তৃক নকশাকৃত ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।’ জাঁ দেলোরা তখন সরকারের স্থাপত্যবিষয়ক উপদেষ্টা। হামিদুর রাহমান শহীদ মিনারের যে মডেল ও স্কেচ উপস্থাপন করেছিলেন দেলোরা তার স্তম্ভগুলোর মাপ পরিবর্তন করে দেন।
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি দ্যা পাকিস্তান অবজার্ভার-এর প্রথম পাতায় শহীদ মিনার সম্পর্কিত খবর দিয়ে যে, প্রতিবেদনটি যুক্ত হলো তার একটি বাক্য ছিল : ’… The memorial has been designed by Mr. Hamidur Rahman in collaboration with miss Novera Ahmed….’। ‘৫২-র ২১ ফেব্রয়ারির রাতে যাঁরা শহীদ মিনার গেঁথে তোলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র কবি রফিক আহমেদ। নির্মাণাধীন শহীদ মিনারে তাঁর নিত্য যাতায়াত ছিল। তিনি জানেন শিল্পীদ্বয়ের যৌথ অবদানের কথা। এই শিল্পীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, একটি সত্য যে কালের হাতে কত সহজে বিস্মৃতি ও বিভ্রান্তিতে পরিণত হতে পারে এখানেই তার প্রমাণ।
সৈয়দ মহম্মদ আলী বলেছিলেন, 'Novera had a major contribution in designing the shaheed minar.’ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর হৃৎকলমের টানে সংকলনটিতে এ-প্রসঙ্গে কয়েকবার লিখেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘… হামিদুর রহমান চিত্রকর, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনাকারী শিল্পী দু’জনের একজন, অপরজন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… মনে পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত আমরা একেবারেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন। যদিও বা কেউ জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম। খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন – হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… কিছুদিন আগে শিল্পী হামিদুর রহমান… ঢাকায় এসে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার দেন… এ সাক্ষাৎকারে হামিদ নভেরার নাম করেননি। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দফতরের একটি প্রামাণ্যচিত্রেও হামিদের বক্তব্য আমরা শুনেছি শহীদ মিনার সম্পর্কে, কিন্তু তাকে শুনিনি নভেরার কথা উল্লেখ করতে’।
কাজের ধারা : শহীদ মিনারের মূল যে স্তম্ভটি, যাকে মাতৃমূর্তির রূপক মনে করা হয় তার আনতভঙ্গি প্রথমে যেটি হামিদুর রাহমান ও নভেরা আহমেদের উপস্থিতিতে নির্মিত হয় সেটি বর্তমানের মাতৃমূর্তিটির মতো কৌণিক ছিল না। নভেরার Seated Woman নামে তিনটি কাজ আছে, কোমল ভঙ্গিতে মা দৃষ্টিনত করে রেখেছে কোলের সন্তানের প্রতি। নভেরার এই মাতৃমূর্তিগুলো সুইজারল্যান্ডের জারম্যাটে ম্যাটার হর্ন (মাদার হর্ন) নামে যে পর্বত শৃঙ্গটি আছে তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। নভেরা সেখানে গিয়ে না দেখলেও অন্তত ছবিতে দেখেছেন। সেই সুউচ্চ পর্বত আর তার আনত শৃঙ্গের সঙ্গে নভেরার ঈষৎ আনত মাতৃমূর্তির সাদৃশ্য আছে, বিশেষভাবে সাদৃশ্য আছে শহীদ মিনারের মাতৃমূর্তির সঙ্গে, সেই পর্বতের সঙ্গে দেশমাতৃকার তুলনা চলে, সন্তানের প্রতি আশীর্বাদ ও স্নেহ আনত যার অপরাজেয় শৃঙ্গ। সাদেক খান বলেন, ‘এ ধরনের বিমূর্ত কাজ তখন নভেরা ছাড়া আর কেউ করেনি।' ‘৫৮ সালের অক্টোবর মাসে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর শহীদ মিনারের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। তবে মিনারের মূল বা সম্পূর্ণ পরিকল্পনা কোনোদিনই বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর হামিদ একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দেবার জন্য আমেরিকায় যান এবং নভেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ শুরু করেন। কিন্তু হাবার্ট রিডের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়, ‘ভাস্করের কাজ কবি বা চিত্রশিল্পীর মতো নয়, ভাস্কর্যের জন্য দরকার খোলা জায়গার, চার্চ বা মার্কেট প্লেসের কারণ সে কাজ রাজসিক ভঙ্গিতে সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে। কিন্তু এধরনের সুযোগ তখন আমাদের দেশে বিশেষ ছিল না এবং সরকার বা ধনী লোকের পৃষ্ঠপোষকতার একান্ত প্রয়োজন ছিল। নভেরা তেজগাঁওয়ের এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে একটি কমিশন পেয়েছিলেন। এর ওপর সৈয়দ শামসুল হকের একটি মন্তব্য আছে, ‘… একটু হকচকিয়ে যেতে হতো এই ভেবে যে সে একজন বাঙালি মুসলমান তার বাড়ির বাগান সাজাবার জন্যে একটি ভাস্কর্য কিনেছেন। এবং সে-ভাস্কর্যটি নারী মূর্তি নয়, কোমলপ্রাণ ও চিত্রিত দেহ কোনো পশুমূর্তি নয় কিংবা ছাঁচে ঢালা কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা কোনো সস্তা কাজও নয়, এক প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীর বিমূর্ত ও পরীক্ষামূলক একটি কাজ।’ এ কাজটিতে নভেরা গ্রামীণ একটি বিষয় ব্যবহার করেছেন, এখানে মানুষ ও গরুর পা এবং শরীর একীভূত হয়ে গেছে। এভাবেই গরুর ও মানুষ উভয়ের ওপর উভয়ের নির্ভরশীলতা বোঝানো হয়েছে। ভাস্কর্যটির কিছু কিছু অংশ বৃত্তাকারে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের রেকিট অ্যান্ড কোলম্যান অফিস এবং ঢাকার অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সামনের লনে নভেরার আরো দুটি কাজ আছে। কাজ দুটি আয়তনে তেমন বড় নয়, উচ্চতায় তিন ফুটের মতো। প্রথমটি অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজ, দ্বিতীয়টি অ্যাবস্ট্রাকটেড মাতৃমূর্তি। ’৫৯ সালে নভেরা বার্মা (মিয়ানমার) গিয়েছিলেন বৌদ্ধমন্দির দেখার জন্য। সেখান থেকে ফিরে বুদ্ধের আসন বা পিস নামকরণে কয়েকটি কাজ করেছেন এবং কয়েকটি ফর্মে কাজটি করেছেন।
নভেরার বেশকিছু ভাস্কর্যে আবহমান বাংলার লোকজ আঙ্গিকের আভাস পাওয়া যায়। তবে লোকজ ফর্মের সাথে সেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়ও বর্তমান। লোকজ টেপা পুতুলের ফর্মকে সরলীকৃত করে তাকে দক্ষতার সাথে বিশেষায়িত করেছেন তিনি। এভাবে ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্য শিক্ষার স্বার্থক ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা তার আধুনিক চিন্তার লক্ষণ। এক্ষেত্রে তার ভাস্কর্যগুলো আদলে তিনকোনা, চোখ ছিদ্র, লম্বা গ্রীবা অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য হিসেবে আসে।
তার কাজের প্রধান দিক হচ্ছে নারীদের প্রতিমূর্তি। সমসাময়িক পুরুষ শিল্পীরা ইউরোপীয় ইন্দ্রিয় সুখাবহ নারীদেহে একটি রোমান্টিক ইমেজ দেবার চেষ্ট করেন। এমনকি জয়নুল, কামরুলরা নারীকে মাতা, কন্যা, স্ত্রী এবং অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখালেও নারীদের যথার্থ কর্মময় জীবন উহ্যই ছিল। তিনি নারীকে দেখলেন সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে, পুরুষ শিল্পীদের উপস্থাপনার বিপরীতে। তার কাজে নর-নারীর কম্পোজিশন একটি ঐক্য গঠন করে। তিনি ভাসা ভাসা সুন্দর আনন্দময়ী আদর্শ ফর্ম গঠন করতে চান নি। তার ফর্মগুলোকে সরল, অর্থপূর্ণ, স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ করেছেন। উন্মোচন করেছেন সবধরণের বিচলিত, আবেগমথিত, সত্যিকারের নারীর রূপকে। মা শক্তিদায়ী, সংকল্পবদ্ধ, অকপট, মৌন আকর্ষণরূপে উদভাসিত। দি লং ওয়েট কাজটি তারই নমুনা। তার মায়েরা সুন্দরী নয়, কিন্তু শক্তিময়ী, জোড়ালো ও সংগ্রামী। কখনো কখনো তারা মানবিকতার প্রতীক। নভেরার কজের পর্যালোচনা: বৃটেনের সমালোচক ম্যারি মারশাল নভেরার দি লং ওয়েট কাজটি সম্পর্কে বলেন, 'এইটি অত্যন্ত চমৎকার ও অদ্ভুত উদাহরণ যেখানে হতাশায় পিছিয়ে পড়া নারী মুক্তির পথ খুঁজছে দৃঢ়তার সাথে।'
নভেরা তার শিল্পকর্মে একঘেয়েমি কাটাতে পরবর্তীতে কতগুলো কাজে ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছিলেন। যেমন: নগ্ন নারী মুর্তি, লম্বা গ্রীবা ও মাথার এনাটমিতে বাংলাদেশের ‘কণ্যা-পুতুলের’ আঙ্গিকের পাশাপাশি হাত-পা-শরীরের অবস্থান স্থাপনের ক্ষেত্রে মদীয়ানির ফর্ম ও ড্রইভের সুষমা, স্তন ও শরীরের উপস্থাপনায় মহেঞ্জোদারোর ‘বালিকা-মূর্তির’ প্রাচ্য অভিলাষকে একত্রিত করেছেন। অন্যদিকে প্লাস্টার অব প্যারিসে নির্মিত দু’টি ভাস্কর্যে মুখমন্ডল বহুলাংশে বাস্তবধর্মী, সামান্য গান্ধারা শিল্পধারায় প্রভাবিত। সম্ভবত এই মস্তক দু’টি বুদ্ধের মস্তকের অণুকরনে অণুকৃতি।
প্রদর্শনী : নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়। ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট রবিবার বিকেলে ’অন্তর্দৃষ্টি’ বা ’Inner Gaze’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আজম খান। দৈনিক আজাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ‘গবর্ণর পাকিস্তানে ভাস্কর্য্য শিল্পের আলোকবর্ত্তিকা বহনকারিনী নভেরার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন এবং তাহার শিল্প সৃষ্টির সহায়তাকল্পে দশ হাজার টাকা সাহায্য ঘোষণা করেন।’ পরের দিন সোমবার থেকে পরবর্তী দশদিন এই প্রদর্শনী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কিছু ভাস্কর্য গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণেও প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ছিল সর্বসাকল্যে প্রায় পঁচাত্তরটি। এর প্রায় তিন যুগ পরে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে সেই প্রদর্শনীর তিরিশটির বেশি ভাস্কর্য সংগৃহীত হয় এবং ১৯৯৮ সালে একত্রে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রদর্শিত হয়। পরে শিল্পপতি এম আর খানের বাড়ির উদ্যানে নির্মিত মুক্তাঙ্গন ভাস্কর্য ‘পরিবার’ (১৯৫৮)ফোয়ারাসহ জাতীয় জাদুঘরের সামনে পুনঃস্থাপিত হয়।
‘অন্তর্দৃষ্টি’ কেবল নভেরা আহমেদেরই নয়, সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষেত্রেই সেটা ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো ভাস্করের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি পাকিস্তানের দুই অংশের শিল্পরসিকদের ব্যাপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তৎকালীন পত্রিকা থেকে জানা যায়, উদ্বোধনের তিনদিন পর ১০ আগস্ট বুধবার গভর্নর-পত্নী মিসেস আজম খান নভেরার ভাস্কর্য প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানান প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির পূর্বাঞ্চল শাখার সদস্যা ডা. ফাতিমা সাদেক, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ এবং শিল্পী স্বয়ং। সেদিনের অন্যান্য দর্শনার্থীর মধ্যে ছিলেন লাহোরের পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সেক্রেটারি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, লাহোর আর্ট কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল শিল্পী শাকির আলী, শিল্পী জয়নুল আবেদিনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
নভেরা আহমেদের দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীর সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রচলিত আছে। মেহবুব আহমেদের মতে, ‘১৯৬৮ সালের শেষদিকে ব্যাংককে নভেরা আহমেদের একক প্রদর্শনী হয়।’ শিল্প ও শিল্পীর দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ২০১২) প্রকাশিত ‘নভেরা : নতুন পথের দিশারী’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি আক্ষেপ করেছেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, নভেরার প্যারিসে করা যে কাজগুলো ব্যাংককে প্রদর্শিত হয়েছিল তার কোনো নিদর্শন পাইনি, এমনকি ব্রোশারও নয়।’
বাংলাদেশের নারী চরিতাভিধানে ব্যাংককের প্রদর্শনী সম্পর্কে সঠিক তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা গ্রন্থমালার চারু ও কারুকলা (২০০৭) সংকলনভুক্ত লালা রুখ সেলিমের লেখায় : ‘১৯৭০ সালে তিনি ব্যাংককে যান এবং প্রাঙ্গণ ভাস্কর্যের প্রদর্শনী করেন।’
ব্যাংকক পোস্ট পত্রিকার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আলী এই প্রদর্শনীর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। আর সম্প্রতি-প্রাপ্ত ‘ব্রোশার’ বা ক্যাটালগের সাক্ষ্য নিয়ে এখন নিশ্চিত করেই বলা সম্ভব, ব্যাংকক আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আয়োজনে নভেরার প্রদর্শনী চলেছিল ১৯৭০ সালের ১৪ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত। আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবনে (২৯ থানন সাথর্ন তাই)এই প্রদর্শনিী হয়। প্রদর্শনী আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন থাইল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মি. রব, শিল্পাকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলংকারিক শিল্পকলা অনুষদের ডিন প্রিন্স ইয়াৎচাই চিত্রাবংস, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ডিরেক্টর মাহমুদ-আল-হক। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছিলেন প্রিন্স কারাবিক চক্রবন্ধু, যিনি নিজেও ছিলেন শৌখিন চিত্রকর ও ভাস্কর। ক্যাটালগে মুদ্রিত ভাষ্য অনুযায়ী :
'This is a unique kind of art exhibition. Novera Ahmed, the most famous sculptress of Pakistan and well known among art circles in London and Paris, presents her recent works in an exposition that provides a welcome break to her self-imposed detachment from public attention. What makes this exhibition all the more unique is that it is also Bangkok’s first open air show of sculptures in direct metal, a medium that poses almost formidable challenges to contemporary artists. In more ways than one, this exhibition should make a vital contribution to the modern art movement in Asia.'
আর এ সময়েই, ১৯৭০ সালের অক্টোবরে, নভেরা আহমেদের ধাতব মাধ্যমে তৈরি ভাস্কর্যের প্রদর্শনীটি ছিল ব্যাংককে। এটি ধাতব ভাস্কর্যের প্রথম মুক্তাঙ্গন প্রদর্শনী। ব্রোঞ্জ ছাড়াও এ-পর্বে নভেরা তাঁর ভাস্কর্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন শিট মেটাল এবং ঝালাইকৃত বা ওয়েলডেড ও স্টেইনলেস স্টিল। ১৯৭৩ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে গ্যালারি রিভগেসে তাঁর প্রদর্শনী হয়েছিল।
সেলিনা হোসেন জেন্ডার বিশ্বকোষের (২০০৬) প্রথম খন্ডের ‘নভেরা আহমেদ’ শীর্ষক ভুক্তিতে লিখেছেন, ‘১৯৮৮ সালে প্যারিসে অবস্থানকালে ব্যাংককের আলিয়ঁস ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস যৌথভাবে তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে।’
৪১ বছর পর প্যারিসে ভাস্কর নভেরা আহমেদের রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি। প্রায় একশো দিন ব্যাপী (১৬ জানুয়ারি—২৬ এপ্রিল ২০১৪) প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর ১৯৬৯–২০১৪ কালপর্বের ৫১টি শিল্পকর্ম (৯টি ভাস্কর্য ও ৪২টি চিত্রকর্ম)।
নির্মিত ভাস্কর্য : ১৯৬১ সালে ‘All Pakistan Painting and Sculpture Exhibition’-এর আয়োজন হয়। বছর দশকের একটি ছেলে ঘরের কাজে নভেরাকে সাহায্য করত। এই এক্সিবিশনের জন্য নভেরা তারই একটি আবক্ষমূর্তি তৈরি করে দিলেন। ক্যারেল ফোগেলের ছাত্রী কাজটির নাম দিলেন 'Child Philosopher'। এর জন্য প্রথম পুরস্কার পেলেন নভেরা।
অবয়বধর্মী ভাস্কর্য ‘Exterminating Angel’ ছয় ফুটের অধিক উচ্চতাবিশিষ্ট স্টাইলাইজড ভাস্কর্যটিতে বিধৃত হয়েছে শকুনের শ্বাসরোধকারী একজন নারীর অবয়ব। এতে প্রকাশিত হয়েছে নারীর হাতে অশুভ শক্তি ও মৃত্যুর পরাভবের প্রতীক। পাকিস্তানের অগ্রগণ্য শিল্প-ইতিহাসবেত্তা সালিমা হাশমি তাঁর Unveiling the Visible : Lives and Works of Women Artists in Pakistan (2002) বইয়ের ‘নভেরা আহমেদ’ শীর্ষক নিবন্ধে ‘Child Philosopher’-‘Exterminating Angel’ শীর্ষক ভাস্কর্যটির নির্মাণকাল ১৯৬০ উল্লেখ করেছেন।
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে ভাস্কর হিসেবে নিজের একটা দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন নভেরা। Pakistan Quarterly পত্রিকার সম্পাদক জালালউদ্দিন আহমেদের Art in Pakistan (করাচি, ১৯৫৪) গ্রন্থের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬২) তাঁর ওপর একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। Contemporary Arts in Pakistan[...] no discussion of Pakistani art would be complete without reference to her [Novera Ahmed].’
সালিমা হাশমি নভেরা আহমেদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘Perhaps the first sculptor in Pakistan to adopt a thoroughly contemporary idiom’।
নভেরা আহমেদের ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বেশ বড় আকারের। ৫ ফুট থেকে শুরু করে এমনকি ৭ ফুট ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত উচ্চতাবিশিষ্ট। একই বিষয়বস্ত্ত নিয়ে নির্মিত একাধিক ভাস্কর্যের মধ্যে ‘পরিবার’ (১৯৫৮), ‘যুগল’ (১৯৬৯), ‘ইকারুস’ (১৯৬৯) ইত্যাদি কাজে মাধ্যমগত চাহিদার কারণেই অবয়বগুলি সরলীকৃত। ওয়েলডেড স্টিলের ‘জেব্রা ক্রসিং’ (১৯৬৮), দুটি ‘লুনাটিক টোটেম’ ইত্যাদির পাশাপাশি রয়েছে ব্রোঞ্জে তৈরি দন্ডায়মান অবয়ব। এছাড়া কয়েকটি রিলিফ ভাস্কর্য ও স্ক্রল। ‘লুনাটিক টোটেম’ বা ‘মেডিটেশনে’র (১৯৬৮) মতো ভাস্কর্যে শিল্পীর মরমি অনুভবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কোথাওবা রয়েছে আদিম ভাস্কর্যরীতি থেকে পরিগ্রহণ। তবে একেবারে ভিন্ন রীতির কাজও ছিল এই প্রদর্শনীতে। বস্ত্ততপক্ষে তেত্রিশটি শিল্পকর্মের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ এগারোটিই ছিল পরিত্যক্ত ভাস্কর্য। ইন্দোচীনে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের ভগ্নাবশেষ থেকে তৈরি এগুলো।
পুরস্কার : ১৯৬১ সালে ভাস্কর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পান নভেরা আহমেদ। পরে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি। তাঁকে নিয়ে জীবনী উপন্যাস রচিত হয়েছে (নভেরা, হাসনাত আবদুল হাই, ১৯৯৪, গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯৯৫), নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র(নহন্যতে, এন রাশেদ চৌধুরী, ১৯৯৯)। জাদুঘরের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল'।
শেষ জীবন ও মৃত্যু : ১৯৭৩ সালের পর নভেরা আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন এবং প্যারিসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন, কিন্তু বড় কোন আঘাত পাননি। কিন্তু ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে হুইলচেয়ারে বসেই তাঁর শেষ জীবন কাটাতে হয়। গতকাল বুধবার (৬ মে,২০১৫) ৮৫ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্যারিসের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। অবসান হয় এক বিশাল ইতিহাসের।
০৭.০৫.২০১৫ 