তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হচ্ছেন
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:৩৬ এএম, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার
ছবি: সংগৃহীত
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়ে গেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই বিএনপির চেয়ারম্যান হচ্ছেন। তবে কবে, কখন এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাঁকে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভোটের কারণে এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপিকে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের ভেতরে এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন—নির্বাচনী প্রচারের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্রে এবং ডিজিটাল পোস্টারে কার ছবি যাবে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানে আসতে হবে বিএনপি নেতৃত্বকে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই বিএনপির অনেক প্রার্থী নির্বাচনী ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, প্রচারপত্র তৈরি করেছেন। অনেকে ডিজিটাল পোস্টার-ব্যানার বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন। এতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি রয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে বাস্তবতা পাল্টে গেছে।
সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫–এর বিধি ৭(চ) অনুযায়ী, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত হলে সে ক্ষেত্রে তিনি শুধু নিজের বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ড বিল ও ফেস্টুনে ছাপাতে পারবেন। ছবি পোর্ট্রেট আকারে হতে হবে এবং তা কোনো অনুষ্ঠান ও জনসভায় নেতৃত্বদান বা প্রার্থনারত অবস্থায় বা ভঙ্গিমায় ছাপানো যাবে না।’
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। যদিও দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, আবার এই পদ ব্যবহারও করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় দলীয় প্রার্থীর প্রচারের ব্যানার-ফেস্টুনে কার ছবি ব্যবহার করা যাবে, সেটা এখনো মীমাংসিত হয়নি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘নির্বাচনী পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি ছাপানোর বিষয় আছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নিতে হবে, আমরা শিগগির কমিশনে যাব।’
দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছয়টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দলের ‘চেয়ারপারসন’ পদটি শূন্য হয়।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাসহ কৌশলগত কারণে বিষয়টি এখনই সামনে আনা হচ্ছে না। বাস্তবে সব সিদ্ধান্ত, দিকনির্দেশনা ও কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করেই। সময়মতো প্রকাশ্য ঘোষণাও আসবে। কারণ, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পুরো দেশ এখনো শোকার্ত। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের পর এখন দলীয় সাত দিনের শোক কর্মসূচি চলছে। ৫ জানুয়ারি শোক কর্মসূচি শেষ হবে। প্রতিদিনই দলের প্রয়াত চেয়ারপারসনের জন্য দোয়ার অনুষ্ঠান হচ্ছে, গতকাল বাদ জুমা ঢাকাসহ সারা দেশেই মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়েছে।
এদিকে শোকের পাশাপাশি ভোটের প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে বিএনপিকে। দলের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সাত দিনের শোক কর্মসূচি শেষ হলেই বিএনপি পূর্ণমাত্রায় নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল বলেন, ‘আমরা এখনো গভীর শোকের মধ্যে আছি। নির্বাচনী কাজে মন থেকে উৎসাহ হয় না। তবু যতটুকু করা সম্ভব করতে হচ্ছে।’
বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও এবারের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। তাঁর মৃত্যু- শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে দল-মতের ঊর্ধ্বে স্থান পাওয়া নেতা খালেদা জিয়ার তাঁর জানাজা ও অন্তিম বিদায়ে মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতি এবং বহির্বিশ্বের শ্রদ্ধা—নির্বাচনে কাজ লাগানোর চেষ্টা থাকবে। অর্থাৎ জনসমর্থনের ঢেউকে ভোটে রূপান্তরের চেষ্টা। বিএনপির লক্ষ্য, এই আবেগকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখা। সে জন্য প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করা, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা, জনসভা, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা বলেন, ভোটের মাঠে দলের স্পষ্ট বার্তা থাকবে যে খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব জীবিত থাকবে।
ইতিমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ও নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়নে জন্য ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রার্থী ব্যবস্থাপনা, বিদ্রোহী প্রার্থীদের থামানো, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং প্রচারের দিকনির্দেশনা—সবকিছু দেখাশোনা করবে।
নির্বাচনের পথে বিএনপির সবচেয়ে বড় বাধা এখন বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শতাধিক আসনে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি বিএনপির এক বা একাধিক নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম (নীরব), কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনসহ ৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ আসনগুলো বিএনপি বিগত আন্দোলনের শরিকদের ছাড় দিয়েছে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, আরও অনেককে মনোনয়ন প্রত্যাহারে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে বহিষ্কারের তালিকা বাড়বে, এ বিষয়ে দলের অবস্থান শক্ত। শোকের আবহেও শৃঙ্খলার প্রশ্নে যে কোনো ছাড় নেই, সে বার্তা দেওয়া হয়েছে ৯ জনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে। বিএনপির নেতৃত্ব মনে করেন, শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনে বিশৃঙ্খলার কারণে নির্বাচনী ঐক্য ভেঙে গেলে সহানুভূতির রাজনীতি টিকবে না।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল বলেন, ‘যাঁদের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে এভাবে ব্যবস্থা (সাংগঠনিক) নেওয়ার বিষয়ে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল।’ তিনি আরও বলেন, এখন তাঁরা (বহিষ্কৃতরা) যদি নিজেরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে দল তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারও করতে পারে।
