ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ৩:১৩:৫২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শীতের কুয়াশায় ১০৮ চুলায় চিতই পিঠার মহোৎসব

পিরোজপুর প্রতিনিধি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:২৭ এএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‎পিরোজপুরের নাজিরপুরে শীতের কুয়াশা ভেদ করে ভেসে আসছিল মাটির চুলার ধোঁয়া আর গরম চিতই পিঠার ঘ্রাণ। কালীমন্দিরের প্রাঙ্গণে সারি সারি জ্বলতে থাকা ১০৮টি মাটির চুলা, নারীদের ব্যস্ত হাত আর চিতই পিঠার গরম ঘ্রাণে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। তীব্র শীত উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী চিতই পিঠা উৎসব এবারও রূপ নেয় জনসমাগমের মহোৎসবে।

‎রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় উপজেলার সদর ইউনিয়নের কুমারখালী বাজারসংলগ্ন দেবলাল চক্রবর্তীর বাড়ির কালীমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় এ শতবর্ষী পিঠা উৎসব। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে উৎসব চলে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত। ধর্মীয় আচারকে ঘিরে শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় এই আয়োজন এখন পরিণত হয়েছে সর্বজনীন উৎসবে।

‎সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ১০৮টি মাটির চুলা। প্রতিটি চুলার ওপর রাখা হয়েছে মাটির সাজ ও সরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নারীরা চালের গুঁড়া দিয়ে চিতই পিঠা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সন্ধ্যা ঘনানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে কেউ ভক্ত, কেউ মানত নিয়ে আসা পুণ্যার্থী, আবার কেউ নিছক দর্শনার্থী। অনেকেই সঙ্গে করে এনেছেন চালের গুঁড়া, জ্বালানি কাঠ ও বাঁশ।

‎সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুরোহিত দেবলাল চক্রবর্তী মন্ত্রপাঠ শুরু করলে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা হয়। তিনি প্রতিটি চুলায় আগুন জ্বালিয়ে দিলে নারীরা পিঠা বানাতে শুরু করেন। সরা তুলে সাজ থেকে পিঠা নামিয়ে বড় পাত্রে জমা করা হয়। পরে সেই পিঠা প্রতিমার ভোগে অর্পণ শেষে প্রসাদ হিসেবে উপস্থিত সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়। বিশেষ করে মানত নিয়ে আসা পুণ্যার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় চিতই পিঠা।

‎বরিশাল থেকে আসা পুণ্যার্থী সুমিত্রা রানী দাস বলেন, ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে আসতাম। বিয়ে হয়ে দূরে চলে গেছি, তবু এই দিনটা এলে মন টানে। মনে হয় এখানকার পিঠার সঙ্গে আমার শৈশব মিশে আছে।

‎গতবছর সন্তানের আশায় এখানে মাতন করে গিয়েছিলেন শ্যামা পাল। এবছর সন্তান কোলে নিয়ে এসেছেন পিঠা তৈরি করতে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমার সন্তান হয় না। গত বছর এখানে এসে মানত করে গিয়েছিলাম। মানত করে যাওয়ার ১ মাসের মধ্যেই আমার সুখবর আসে। এ বছর সন্তান কোলে নিয়ে চিতই পিঠা বানাতে এসেছি।

‎স্থানীয় বাসিন্দা রাহুল বিশ্বাস বলেন, আগে শুনতাম এটা শুধু মানতের আয়োজন ছিল। এখন এটা আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় উৎসব। ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে সবাই এখানে আনন্দ করতে আসে।

‎মনোবাসনা পূরণের আশায় আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুসলিম গৃহবধূ বলেন, আমার সন্তান না হওয়ায় এখানে এসেছি। মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসার জায়গা তো সবার জন্য তাই এসেছি।

‎১৯৮৬ সাল থেকে বংশপরম্পরায় এই মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন দেবলাল চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ৯২ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ হরষিত আনন্দ চক্রবর্তী মাঘের অমাবস্যা তিথিতে এই কালীমন্দির প্রাঙ্গণে মেলার আয়োজন করতেন। অমাবস্যায় শুকনা খাবার খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় মন্দিরে চিতই পিঠা তৈরি করে প্রসাদ দেওয়ার নিয়ম চালু হয়। মানুষ মনোবাসনা পূরণের আশায় এই পিঠা গ্রহণ করতেন। যুগের পর যুগ ধরে সেই রীতিই আজও চলে আসছে। বর্তমানে পুণ্যার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় পিঠা তৈরির এই আয়োজন ধীরে ধীরে বৃহৎ উৎসবে রূপ নিয়েছে।

‎শত বছরের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই আয়োজন আজ আর কেবল ধর্মীয় রীতি নয় পরিণত হয়েছে নাজিরপুরের সর্বজনীন লোকউৎসবে। বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মানুষের মিলনেই টিকে আছে চিতই পিঠার এই অনন্য উৎসব।