আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪.কম
প্রকাশিত : ০৯:১৫ এএম, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৭:৫২ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার
আজ ১৫ অক্টোবর সোমবার আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। গ্রামীণ নারীদের কাজের স্বীকৃতি আদায় আর মজুরি বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে পালিত হয় দিবসটি। প্রতিবছরের মতো এবারো জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশও দিবসটি পালন করছে।
দেশের ৪০টির বেশি জেলায় উদযাপন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারো সারা দেশে শোভাযাত্রা, সেমিনার, মানববন্ধন, মেলা আয়োজনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হবে।
২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের ভূমিকার প্রতি স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তার রেজুলেশন নম্বর ৬২/১৩৬ এর মাধ্যমে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উদযাপন করে আসছে। এর আগে ১৯৯৫ সালে গ্রামীণ নারীদের খাদ্য উৎপাদনসহ বহুমুখী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের স্বীকৃতির জন্য বেইজিং সম্মেলনেই প্রতি বছরের ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে এই দিবস বিশ্বের গ্রামীণ নারীদের অধিকার বাস্তবায়নে সংগঠিতভাবে পালিত হচ্ছে।
দেশে ৭০ শতাংশের বেশি ভূমিহীন নারী কৃষিকাজে জড়িত। জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ নারীরা (গৃহিণী) ঘর ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন কৃষিকাজ, ব্যবসা বা চাকরিতে। সারা বছরই নানা ধরনের কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে উপার্জন করেন তারা। মজুরির ক্ষেত্রে পান পুরুষের অর্ধেক। এরপরও লড়ে চলেছে গ্রামীণ জনপদের সুবিধাবঞ্চিত নারীসমাজ।
নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে টিকে থাকার লড়াই যা বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চরিত্র। গত এক দশকের ব্যবধানে কৃষিকাজে প্রত্যক্ষভাবে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ।
তুলনামূলক নিম্নমজুরি কৃষিকাজে নারীদের যুক্ত হতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় নারীর মজুরি এখনও প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম।
কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৈষম্য রয়েছে। এখনও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। তবে অগ্রগতি হয়েছে উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায়, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাটে। এছাড়া কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জেও কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
জীবন-জীবিকার তাগিদে গ্রামীণ নারী ঘর ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন কৃষিকাজ, ব্যবসা বা চাকরিতে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচি কিংবা ক্ষুদ্র ঋণ ও কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তনশীলতা একে আরও ত্বরান্বিত করছে। পারিবারিক ভাঙন সমাজে স্বামী পরিত্যক্ত ও বিধবা নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি ন্যূনতম প্রশিক্ষণহীন এক নারীকে কৃষিজীবী নারীতে পরিণত করছে প্রতিদিন।
কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ শুধু বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এ খাতের কর্মকাণ্ডে তাদের উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমবিভাজন নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়েছে। তুলনামূলক কম ভারি কাজ, বিশেষ করে ফসল বা খাদ্যশস্য কাটার পর তার বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নারীদের। তাছাড়া অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে চলা কাজ, যেমন সেচকাজ পরিচালনা, ফসলের ক্ষেত তদারক করার কাজেও নারীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষিকাজে অংশগ্রহণের কারণে গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত নারীর সংখ্যাও কমে আসছে।
তবে যে কারণেই পরিবারের নেতৃত্বে আসুক না কেন, পরিবারপ্রধান হওয়ায় নারীর আর্থিক সচ্ছলতা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষিক্ষেত্রে নারীর এ অংশগ্রহণ তার সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। কয়েক বছর আগেও শুধু তালাকপ্রাপ্ত নারীকেই পরিবারপ্রধান হতে দেখা যেত। এতে সমাজে কেবল বঞ্চিত মানুষের সংখ্যাই বাড়ত। কিন্তু আজকে সে অবস্থা বদলেছে। এসব নারী প্রতিবন্ধকতা জয় করেই পরিবারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পরিবারপ্রধান হিসেবে নারীর সংখ্যা বাড়ার সুফল ভবিষ্যতে প্রভাব বিস্তার করবে সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি অর্থনীতিতে।
এতে নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, বিবাহ-পরবর্তী সময়ে নারীর প্রতি নির্যাতন কমে আসবে এবং সমাজে তার অধিকার দৃঢ় হবে। এতে একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ সৃষ্টি হয়ে নারীর স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। আগামী দিনের অর্থনীতি-রাজনীতি ও সমাজ বিনির্মাণে কৃষিজীবী নারীর একটি সুস্পষ্ট অবস্থান তৈরি করবে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, তেমনি এ খাতে নারীর অবদানও অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষি খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি ও তাদের ন্যায্য মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে এ কাজে নারীরা আরো আগ্রহী হবে এবং দেশে কৃষির উৎপাদন আরো বাড়বে।
কৃষি ক্ষেত্রের পাশাপাশি খেলাধুলাতেও গ্রামের নারীরা আগের তুলনায় বেশি এগিয়ে আসছেন। সর্বোপরি গ্রামীণ নারীর উন্নয়ন ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তাকে আরও সচেতন হতে হবে। তার চিন্তাধারার পরিবর্তন আসতে হবে। প্রকৃতপক্ষে নারীরা সব কাজের জন্য উপযুক্ত। এটাই চিরন্তন সত্য। এই বিশ্বাসের আলো নিয়েই গ্রামীণ নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবেন ।
