সারা দেশে অবাধে শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৩:৪০ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ বুধবার
ছবি: সংগ্রহিত।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও হাটবাজারে প্রকাশ্যেই শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি। নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমি এলাকায় ফাঁদ পেতে ধরা হচ্ছে হাঁসজাতীয় ও ছোট-বড় নানা প্রজাতির পাখি। পরে সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকানে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রতি বছর শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশে আসে। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে তারা এখানে এসে পড়ছে শিকারিদের ফাঁদে। এতে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য।
প্রকাশ্যে বেচাকেনা: রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও ফুটপাথে খাঁচাবন্দি পাখি বিক্রির দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। বিক্রেতারা প্রকাশ্যেই হাঁসজাতীয় ও বন্য পাখি বিক্রি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে পাখিগুলো জীবিত অবস্থায় খাঁচায় আটকে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও জবাই করেও বিক্রি করা হচ্ছে।
এক বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শীতে পাখির চাহিদা বেশি। মানুষ কিনে রান্না করে খায়। আমরা শুধু বিক্রি করি।”
আইনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রয়োগ নেই: বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্য পাখি শিকার, হত্যা ও বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইনে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে আইনের প্রয়োগ খুব সীমিত বলে অভিযোগ পরিবেশ সংগঠনগুলোর।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও তা নিয়মিত নয়। ফলে শিকারিরা নির্ভয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশের জন্য হুমকি: বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিযায়ী পাখি শুধু সৌন্দর্য নয়, তারা প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও কাজ করে। কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং খাদ্যচক্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাখি কমে গেলে এর প্রভাব পড়বে কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার ওপরও।
জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “একটি পাখি ধরা মানে শুধু একটি প্রাণী মারা যাওয়া নয়, একটি প্রাকৃতিক চক্রের ছেদ ঘটানো।”
সচেতনতার অভাব: পাখি শিকার বন্ধে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে জনসচেতনতার অভাব। অনেক মানুষ জানেন না যে পাখি শিকার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আবার কেউ কেউ জেনেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
পরিবেশ সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শীত মৌসুমে হাওর ও জলাভূমি এলাকায় নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
করণীয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, হাওর ও জলাভূমিতে নজরদারি জোরদার, বাজারে বন্য পাখি বিক্রি বন্ধে অভিযান ও গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরী। এগুলো বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে শীতের অতিথি পাখির সংখ্যা আরও কমে যাবে।
পরিবেশবিদ ফরিদা রহমান বলেন, “পাখি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, আমাদের ভবিষ্যতের অংশ। তাদের রক্ষা করা মানে নিজেদেরই রক্ষা করা।”
