ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬:৫৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

এক বছরে ১৭ লাখ শিশুর জন্ম অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:৫৫ এএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গত বছর দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে। একটি হিসাব বলছে, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আন্তরিকতার অভাব ও সরকারি নজরদারির ঘাটতির কারণে দেশে সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো বিষয়ে একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়। ‘রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ)। এতে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি এটি কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।

সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক গাফিলতি আছে। দেশে শিশুজন্মে অস্ত্রোপচার অনেক বেশি হচ্ছে। ফলে মায়েরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। বাস্তবতা হলো দেশে এখন আর স্বাভাবিক প্রসব নেই বললেই চলে।

সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক আনজুমান আরা। তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে ৫টি শিশুর জন্মের মধ্যে ১টির জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (প্রায় ২১ শতাংশ)। বাংলাদেশে এই হার অনেক বেশি। এখানে প্রতি ২টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ১টি শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে (প্রায় ৪৫-৫২ শতাংশ)। বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেখানে প্রতি ১০টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ৮-৯টিই হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (৮৫-৯০ শতাংশ)। 

অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, গত বছর (২০২৫ সালে) দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

২০১৮ সালের এক গবেষণার উল্লেখ করে আনজুমান আরা বলেন, বছরে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা বা মানসম্মত লেবার রুম (প্রসবকক্ষ) নেই। ফলে আর্থিক লাভকে অগ্রাধিকার দিয়ে অস্ত্রোপচারকে সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেওয়া কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৩০ শতাংশ হতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। ২০০৭ সালে এই হার ৫১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৯০ শতাংশই হবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করায় গর্ভধারিণী মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হয়। তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে মায়েরা মারা যেতেন অস্ত্রোপচার না করার জন্য, আর এখন অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারে করার জন্য তাঁরা মারা যাচ্ছেন।

কেউই সময় দিতে চান না

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক ও গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে সময় লাগে। কিন্তু অধিকাংশ রোগী ও চিকিৎসক এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান না। প্রচলিত একটি ভুল ধারণা খণ্ডন করে তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন, স্বাভাবিক প্রসবের কারণে শিশুর মস্তিষ্কে ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু প্রসব-পূর্ব সেবা যথাযথ না হওয়ার কারণে নবজাতকের মস্তিষ্কে ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে প্রসবের আগে। আর প্রসবকালীন সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয় ১০ শতাংশেরও কম।

স্বাভাবিক প্রসবের গুরুত্ব তুলে ধরে খুরশীদ তালুকদার বলেন, এই প্রক্রিয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের শরীরের উপকারী জীবাণু বা মাইক্রোবায়োম শিশুর শরীরে স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো স্বাভাবিক প্রসব এবং এতে জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে শিশুর ‘স্কিন-টু-স্কিন’ কন্ট্যাক্ট ঘটে। অস্ত্রোপচারে জন্ম নেওয়া শিশুরা এই মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ছিল ৬২ থেকে ৭২ শতাংশ। এরপর সেখানে প্রসব-পূর্ব কাউন্সেলিং, রোবসন শ্রেণিবিন্যাস, লেবার মনিটরিং, কনসালট্যান্ট অডিট এবং আগের সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব (ভিএবিসি) পদ্ধতি চালু করা হয়। এর ফলে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবের হার ৪২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য ২০২২-২৩ সালে গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আটটি প্রতিষ্ঠানে এই মডেল সম্প্রসারণ করা হলেও আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যায়নি।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের (এডব্লিউসিএইচ) চিকিৎসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন আহমেদ।