৬ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে নির্বাচিত সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৮:৪৫ এএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে তাদেরকে চলমান ব্যাপকভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ৬টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
এক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। নতুন সরকারকে বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার করে আয় বাড়ানো, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আগামী সরকারের জন্য অর্থনীতিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঝুঁকি নিরসনে গুরুত্ব দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।
শনিবার আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে এসব চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর সংস্থাটির দেওয়া ঋণ কর্মসূচির শর্ত পর্যালোচনা প্রতিবেদনটি ২৬ জানুয়ারি তাদের নির্বাহী পর্ষদে অনুমোদন করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনটি শনিবার প্রকাশ করেছে। তবে আইএমএফ আগেই জানিয়েছিল, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া তারা ঋণের কিস্তি ছাড় করবে না। গত ডিসেম্বরে ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় করার কথা ছিল।
আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের সঙ্গে সংস্থাটির নতুন করে আলোচনা শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। তারা বলেছে, ভবিষ্যতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবহিদিতা নিশ্চিত করা এবং কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হলে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বা নতুন সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। প্রতিবেদনে আগামী সরকারের জন্য বেশকিছু ঝুঁকির ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকির পাশাপাশি বৈদেশিক ঝুঁকিও রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে-প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও ধীর। প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে সরকারের জন্য বেশ ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাজস্ব আয় কম হওয়ার কারণে সরকারের ব্যয় বাড়ানো এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমিত সম্পদের কারণে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আর্থিক দায় রয়েছে। সেগুলোর বড় অংশই ২০২৪ সালের আন্দোলনের আগে সৃষ্ট। এসব দায় পরিশোধ সরকারের ওপর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রে আগামী সরকারকে মাঝারি ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
রাজস্ব আহরণে নিম্নমুখিতা সরকারের জন্য ইতোমধ্যে একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। আগামী দিনে রাজস্ব বাড়ানো হবে আরও চ্যালেঞ্জিং। কারণ, প্রবৃদ্ধি এখনো নিম্নমুখী, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে এসব খাতকে চাঙা করতে হবে। পাশাপাশি সংস্কার কার্যক্রমও এগিয়ে নিতে হবে। এই কাজ নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। এ খাতে সফলতা অর্জন করতে না পারলে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক ও জনপ্রত্যাশার কারণে সরকারি খরচ বেড়ে যাবে। এতে সরকারি ব্যয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি ব্যয় একেবারেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এ ব্যয় বাড়লে এবং রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো সম্ভব না হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও নষ্টের ঝুঁকি রয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের (প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে বলা হয়েছে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পূর্ববর্তী সরকার) সময়ে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওইসব তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ হতে থাকে। ফলে বর্তমান সরকার ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিতে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। কাঠামোগত সংস্কারও এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর অব্যাহত লোকসানের কারণে তাদের পক্ষে বাড়তি ঋণের চাহিদা মেটানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে। এতে সরকারি খাতে অর্থায়নের ঝুঁকি বাড়বে এবং সরকারি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ডলারের বিপরীতে নতুন বিনিময় হার পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি চালু করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে টাকার অবমূল্যায়ন ভবিষ্যতে বেড়ে যেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে বিপদে ফেলতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিশৃঙ্খলতা দেখা দিতে পারে।
আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তৈরি পোশাক রপ্তানির বাজার অংশীদারত্ব হ্রাস পাচ্ছে। এতে বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যহীনতাকে আরও নেতিবাচক করে দিতে পারে। যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোয় দেশের পোশাক খাতের রপ্তানি আয়সহ সার্বিকভাবে রপ্তানি আয় বাড়বে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা ব্যাহত হলে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ও এর আশপাশে অস্থিতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে আর্থিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হলে নতুন সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি কমাতে, কর্মসংস্থানবান্ধব আর্থিক নীতি গ্রহণ এবং ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের জন্য গ্রহণযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি নিতে হবে, যা গ্রাহক ও অংশীজনের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়।
প্রতিবেদনে চড়া মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোকাবিলা করতে চলমান সংকোচনমুখী বা ঋণের সুদের হার চড়া রাখার মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে সুপারিশ করা হয়। পরিবেশগত ঝুঁকি নিরসনে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে বলা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশে থাকতে পারে। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। আগামী অর্থবছরে তা প্রায় ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সম্প্রতি ধীরগতিতে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বছরভিত্তিক হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৬ শতংশ। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসের হিসাবে ২ শতাংশের নিচে রয়েছে।
মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল হিসাবে কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে বলা হয়েছে। বর্তমানে তা ৮ শতাংশে রয়েছে। ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে রাজস্বনীতি এবং রাজস্ব আদায়ে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ব্যাপকভাবে সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা থেকে ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে ও আর্থিক খাতে সংস্কার বাস্তবায়নে দেরি হলে অর্থনীতিতে বিদ্যমান নেতিবাচক পরিস্থিতিতে আরও ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজস্ব আহরণে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, মধ্য মেয়াদে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন, সুশাসনব্যবস্থা জোরদার করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা।
চলতি বছর শেষে রিজার্ভ ৩০.৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে। আগামী অর্থবছরে গিয়ে তা ৩৫.৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি আরও বাড়বে। চলতি অর্থবছর শেষে তা বেড়ে ১২৬ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। আগামী অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩২১ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।
তবে প্রতিবেদনে বেশকিছু বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-মধ্য মেয়াদে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের আশা করা হচ্ছে। কর রাজস্ব সংগ্রহ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলার জন্য নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে প্রায় ৬ শতাংশে উঠতে পারে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বিশেষভাবে তারল্যের জোগান দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে সংস্থাটি বলেছে, এতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হবে এবং আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করতে এবং স্বল্পোন্নত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য বলে মন্তব্য করা হয়েছে। তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন ও মানি লন্ডারিং কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গভীর কাঠামোগত ও সামাজিক দুর্বলতাগুলো উন্মোচিত হয়েছে। দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টনের দিকে পরিচালিত করেছে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বৈষম্য এবং বর্জনের ওপর জনসাধারণের অসন্তোষ বৃদ্ধির কারণে ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে।
