নির্বাচনের আগে: স্লোগানের রাজনীতি ও জনমনের ভাষা
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:২৯ পিএম, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার
ফাইল ছবি।
নির্বাচন এলেই শহর ও গ্রামের দেয়াল, মিছিলের ব্যানার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ভেসে ওঠে নানা রকম রাজনৈতিক স্লোগান। কয়েকটি শব্দে একটি দলের স্বপ্ন, দাবি কিংবা প্রতিশ্রুতিকে ধরতে চায় এই স্লোগানগুলো। কখনো তা উত্তেজনার আগুন জ্বালায়, কখনো আশার আলো দেখায়, আবার কখনো ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে স্লোগান যেন হয়ে উঠেছে রাজনীতির সবচেয়ে সরল কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
স্লোগান: ছোট বাক্যে বড় বার্তা: রাজনৈতিক স্লোগানের মূল শক্তি তার সংক্ষিপ্ততায়। দীর্ঘ বক্তৃতার বদলে দুই–তিনটি শব্দেই জনতার আবেগকে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকে এতে। ইতিহাস বলছে, বহু আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল এমন কিছু স্লোগান, যা মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে এবং একসময় হয়ে উঠেছে সময়ের প্রতীক।
স্লোগান কেবল দলের কথা বলে না; বলে সময়ের কথা, সমাজের হতাশা ও প্রত্যাশার কথা। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার কিংবা উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা—সবই ধরা পড়ে স্লোগানের ভেতর দিয়ে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে স্লোগানের ব্যবহার: নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো স্লোগানকে ব্যবহার করে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে। কেউ উন্নয়নের কথা সামনে আনে, কেউ পরিবর্তনের ডাক দেয়, কেউ স্থিতিশীলতার কথা বলে। মিছিল-মিটিং, পোস্টার, লিফলেট এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও স্লোগান হয়ে ওঠে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে স্লোগানের জনপ্রিয়তা অনেক সময় নির্ভর করে তার ভাষার ওপর। সহজ, ছন্দময় ও স্মরণযোগ্য শব্দই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। তাই রাজনীতির ভাষা ধীরে ধীরে কবিতার কাছাকাছি চলে আসে—যেখানে ছন্দ আছে, আবেগ আছে, আর আছে বার্তা।
স্লোগান ও জনমত: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্লোগান এক ধরনের জনমত তৈরির হাতিয়ার। এটি মানুষকে ভাবতে শেখায়—কে কী চাইছে, কার সঙ্গে কে আছে। তবে স্লোগান বাস্তবতার বিকল্প নয়। সুন্দর শব্দের আড়ালে বাস্তব কর্মসূচি না থাকলে তা দ্রুতই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই সচেতন ভোটারদের জন্য স্লোগান শোনার পাশাপাশি তার ভেতরের অর্থ বোঝা জরুরি। স্লোগান কাকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে, কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে এবং তা বাস্তবসম্মত কি না—এসব প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ।
সংস্কৃতি ও স্লোগান: বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্লোগানের আলাদা একটি ইতিহাস আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি অধ্যায়ে স্লোগান ছিল মানুষের কণ্ঠের ভাষা। কবিতা, গান ও নাটকের মতোই স্লোগানও হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের এক শিল্পরূপ।
আজকের নির্বাচনী পরিবেশে সেই ঐতিহ্যের নতুন রূপ দেখা যায়। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নতুন স্লোগান জন্ম নেয়, কখনো পুরোনো স্লোগান নতুন অর্থে ফিরে আসে।
শেষ কথা: নির্বাচন মানেই শুধু ব্যালটের লড়াই নয়, শব্দেরও লড়াই। স্লোগান সেই শব্দযুদ্ধের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ। এটি রাজনীতিকে মানুষের কাছাকাছি আনে, আবার কখনো রাজনীতির মুখোশও হয়ে ওঠে।
তাই আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে স্লোগানগুলোকে কেবল শোনা নয়, বোঝার চেষ্টা করাই নাগরিক দায়িত্ব। কারণ প্রতিটি স্লোগানের পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি দর্শন, একটি স্বপ্ন—আর কখনো কখনো একটি প্রশ্ন: আমরা কোন পথে যেতে চাই?
