শিশু-কিশোরদের জন্য কতটা নিরাপদ ডিজিটাল দুনিয়া?
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৩:৩২ পিএম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার
ফাইল ছবি।
ফ্রান্সের পর স্পেন ও গ্রিসও সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর কড়াকড়ি আরোপের পথে হাঁটছে। তাদের যুক্তি একটাই—এই মাধ্যম আর আগের মতো “পজিটিভ স্পেস” নেই। বরং শিশু-কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য এটি হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ এক জগৎ। ইউরোপের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সোশ্যাল মিডিয়া কি সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে এক অদৃশ্য সংকটের দিকে?
এক সময় সোশ্যাল মিডিয়াকে বলা হতো যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, পড়াশোনার তথ্য খোঁজা কিংবা সৃজনশীলতা প্রকাশ—সবই ছিল এর ইতিবাচক দিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলো পরিণত হয়েছে লাইক, ফলোয়ার আর ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায়। সেই প্রতিযোগিতার প্রথম ও সবচেয়ে দুর্বল শিকার হচ্ছে শিশুরা।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আঘাত
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া শিশু-কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ (anxiety) ও হতাশা (depression) বাড়াচ্ছে। অন্যদের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে। “আমি তেমন সুন্দর নই”, “আমার জীবন এত রঙিন নয়”—এমন তুলনা থেকেই জন্ম নেয় আত্মবিশ্বাসের সংকট। ধীরে ধীরে তৈরি হয় একাকিত্ব ও মানসিক চাপ।
আসক্তি: স্ক্রিনই হয়ে উঠছে সব
শিশুদের বড় একটি অংশ দিনে কয়েক ঘণ্টা কাটাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনে। পড়াশোনার ফাঁকে নয়, বরং পড়াশোনার সময়ও চোখ আটকে থাকছে রিলস, শর্ট ভিডিও কিংবা গেমে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার কারণ হচ্ছে। বইয়ের পাতা নয়, স্ক্রিনই তাদের প্রধান জগত হয়ে উঠছে।
সাইবার বুলিং: নীরব নির্যাতন
আগে স্কুলে বুলিং হতো মাঠে বা ক্লাসরুমে, এখন তা ঢুকে পড়েছে মোবাইল ফোনে। ফেসবুক পোস্টে কটূক্তি, ইনস্টাগ্রাম কমেন্টে অপমান, মেসেঞ্জারে হুমকি—এসবই সাইবার বুলিংয়ের রূপ। অনেক শিশু ভয় বা লজ্জায় পরিবারকে কিছু বলে না। ফলে মানসিক আঘাত আরও গভীর হয়, কখনো কখনো আত্মহানির চিন্তাও তৈরি হয়।
বিকৃত কনটেন্টের সহজলভ্যতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে শিশুরা খুব সহজেই সহিংসতা, অশ্লীলতা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। অ্যালগরিদমের কারণে তারা একবার যে ধরনের ভিডিও দেখে, সেটাই বারবার সামনে আসে। ফলে ধীরে ধীরে সহিংসতা বা অনৈতিক আচরণ তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সম্পর্কের জায়গায় ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব
শিশুদের সামাজিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন খেলাধুলা, আড্ডা, মুখোমুখি কথা বলা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে। মাঠের বদলে মোবাইল, বন্ধুর বদলে স্ক্রিন—এতে বাস্তব সম্পর্কের চর্চা কমে যাচ্ছে। তারা কথা বলতে শিখছে ইমোজিতে, অনুভূতি প্রকাশ করছে স্টিকারে।
ইউরোপের কঠোরতা, আমাদের বাস্তবতা
ফ্রান্স, স্পেন ও গ্রিসের মতো দেশগুলো মনে করছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া নয়, বরং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও। তাই তারা বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, সময়সীমা নির্ধারণ ও কিছু প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবছে। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো কি এই ঝুঁকির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তান কী দেখছে, কত সময় দিচ্ছে—সেটা জানা। স্কুলে ডিজিটাল লিটারেসি শেখানো জরুরি, যাতে শিশুরা ভালো-মন্দ আলাদা করতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া নিঃসন্দেহে আধুনিক জীবনের অংশ। কিন্তু শিশু-কিশোরদের হাতে এটি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপের দেশগুলোর পদক্ষেপ আসলে এক ধরনের সতর্কবার্তা—প্রযুক্তির সঙ্গে চলতে হলে মানবিক বোধ ও দায়িত্ববোধও সমানভাবে দরকার। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে কানেক্টেড দুনিয়া, কিন্তু হারাবে সুস্থ মন ও শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ।
