ঢাকা, শুক্রবার ০৬, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৭:১৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

একজনের সংস্থা ‘পাশা’ দিচ্ছে ১০ হাজার পর্যবেক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৪৬ এএম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

নিজের বাসার একটি কক্ষকেই কার্যালয় বানিয়েছেন তিনি। সেটিও প্রকৃত অর্থে কোনো অফিস নয়—এটি ‘পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট (পাশা)’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের বাসা। লোকবল বলতে তিনি একাই। অথচ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এই সংস্থাই ১০ হাজারের বেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক দিচ্ছে।

‘নামসর্বস্ব’ এই সংস্থার কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রাম। সংস্থাটির কার্যক্রম ও জনবল সম্পর্কে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য।

সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষকের অনুমোদন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৮১টি দেশি সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাশারই রয়েছে ১০ হাজার ৫৫৯ জন, যা মোট দেশি পর্যবেক্ষকের প্রায় ১৯ শতাংশ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজস্ব কোনো স্থায়ী কর্মী না থাকলেও পাশাকে ১২৭টি সংসদীয় আসনে পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ ‘স্বেচ্ছাসেবী’ এই সংস্থার নিজস্ব কোনো প্রকল্প নেই। সাধারণত তারা অন্যান্য এনজিওর সহযোগী হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে উল্টো চিত্র—পাশাই অন্যান্য এনজিওকে সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে।

পাশার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছে কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (কার্ড), সংখ্যা ৩ হাজার ৫৬১ জন। এক হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক রয়েছে—এমন সংস্থা রয়েছে ১৫টি।

নিবন্ধনের ইতিহাস

স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইসিতে নিবন্ধিত হতে হয়। গত বছরের ২৭ জুলাই আগের সব নিবন্ধন বাতিল করে নতুন করে আবেদন আহ্বান করে ইসি। ৭ নভেম্বর প্রথম দফায় ৬৬টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। সেখানে পাশার নাম ছিল না। পরে ডিসেম্বর মাসে পাশাসহ আরও ১৫টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় মোট নিবন্ধিত সংস্থা দাঁড়ায় ৮১টি।

ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা

ভোটের দিন ভোটার ও ইসির অনুমোদিত ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ কেন্দ্রে ঢুকতে পারেন না। অনুমোদিত পর্যবেক্ষকেরা গোপন কক্ষ ছাড়া কেন্দ্রের অন্য অংশে যেতে পারেন এবং ভোট গণনার সময়ও উপস্থিত থাকতে পারেন। নির্বাচন শেষে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত প্রতিবেদন ইসিতে জমা দিতে হয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে।

পাশা সম্পর্কে যা জানা গেল

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নিবন্ধন পায় পাশা। কাগজে–কলমে তাদের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, যৌতুকবিরোধী আন্দোলন ও বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ। তবে নিবন্ধনের পর থেকে সংস্থাটি কার্যকরী কমিটি অনুমোদনের জন্য কখনো আবেদন করেনি।

স্থানীয়ভাবে পাশা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর ও মোহনপুর এলাকায় কার্যালয় চালু করা হলেও নারীদের চাকরি দেওয়ার নামে নানা অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের প্রতিবাদে সেসব স্থান ছাড়তে হয়। পরে কখনো চুনারুঘাট, কখনো শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় কার্যালয় খোলা হলেও কোনো স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ওঠেনি।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রিও করেছিল পাশা।

সরেজমিনে পাশার কার্যালয়

গত বুধবার চুনারুঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বরমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি একতলা বাড়িতে ‘পাশা’ নামে সাইনবোর্ড লাগানো। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবীরের বসতবাড়ি। তিনি নিজের বাসার একটি কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন।

দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির মূল ফটকে তালা ঝুলছে। ভেতরে কাউকে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেশী শফিকুল ইসলাম ও জুনায়েদ মিয়া বলেন, এটি মূলত বসতবাড়ি হিসেবেই পরিচিত। অফিসের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

বরমপুর বাজারের ব্যবসায়ী কাদির মিয়া বলেন, “বাড়িতে পাশার সাইনবোর্ড দেখেছি। কিন্তু কী কাজ করে, সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।”

একটি ক্ষুদ্রঋণ এনজিওর পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাশার এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন নেই। এটি মূলত সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান।

কোথায় কত পর্যবেক্ষক

ইসির প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ৩০০ আসনে ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে পাশার রয়েছে ১০ হাজার ২৫০ জন। যদিও সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক দাবি করেছেন, ১১৯টি আসনে তাঁদের ১০ হাজার ৭৯২ জন পর্যবেক্ষক থাকবে।

তালিকায় দেখা যায়, ৪১টি আসনে পাশার ১০০ বা তার বেশি পর্যবেক্ষক রয়েছে। সর্বোচ্চ ৩০৫ জন থাকবে মৌলভীবাজার–৩ আসনে।

মৌলভীবাজারের চারটি আসনেই সর্বাধিক পর্যবেক্ষক পাশার। একই চিত্র সিলেট, হবিগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায়ও দেখা গেছে।

পাশার ব্যাখ্যা

পাশার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবীর বলেন, তাঁর সংস্থা ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীবিষয়ক কাজে বিভিন্ন এনজিওর সহযোগী হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে কোনো প্রকল্প না থাকায় তাঁরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন।

খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। অর্থ না পেলে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা হবে।

প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাধারণ পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ নেই। তবে দলনেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।”

পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ভালো কাজ করলে সমালোচনা থাকবেই। এতে আমাদের কিছু যায় আসে না।”

ইসির বক্তব্য

ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের পরই সংস্থাগুলোকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “নিবন্ধিত সংস্থাগুলো যে পরিকল্পনা দিয়েছে, তাতে ব্যত্যয় মনে হয়নি। কেউ যদি ভিন্ন তথ্য দেন, আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।”

আগেও ছিল বিতর্ক

এর আগে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও কয়েকটি পর্যবেক্ষক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ২০১৮ সালে ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম ও সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “পর্যবেক্ষক অনুমোদনে ইসি প্রয়োজনীয় যাচাই–বাছাই করেনি। পক্ষপাতদুষ্ট সংগঠনকেও অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি ইসির সক্ষমতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত নয়।”

সুত্র: বিবিসি বাংলা অনলাইন ও প্রথম আলো