ঢাকা, শুক্রবার ০৬, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:০৪:৪৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ: স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি না আনুষ্ঠানিকতার ফাঁদ

জোসেফ সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫৫ এএম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং সেই ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাই নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ একটি অপরিহার্য উপাদান। কারণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে—তা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কি সত্যিই সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হচ্ছে?

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ভোটগ্রহণের পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোট গণনার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। তাঁরা সরাসরি নির্বাচনী ফল নির্ধারণ করেন না; বরং নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে, সে বিষয়ে জনগণ ও নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি চিত্র তুলে ধরেন। এই ভূমিকা সঠিকভাবে পালিত হলে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক অনেকটাই কমে আসার কথা।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর নিজস্ব অবকাঠামো দুর্বল, প্রশিক্ষিত জনবল নেই, তবু বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এতে পর্যবেক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা। কিন্তু যখন পর্যবেক্ষক সংস্থার অর্থায়ন, রাজনৈতিক সম্পর্ক বা সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জনগণের মনে তখন এই সন্দেহ জন্মায় যে, পর্যবেক্ষকেরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন, নাকি নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কেবল উপস্থিত থাকা নয়; এটি একটি পদ্ধতিগত কাজ। কোন অনিয়ম কীভাবে নথিভুক্ত করতে হবে, কোন ঘটনা নির্বাচন আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, কোন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে—এসব বিষয়ে পর্যবেক্ষকদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যবেক্ষকদের বড় একটি অংশের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে তারা শুধু ভোটকেন্দ্রে বসে থাকা বা ঘোরাফেরা করার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন। এতে প্রকৃত অর্থে পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আরেকটি বড় দিক হলো পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন। নির্বাচন শেষে যে প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার কথা, সেটি কেবল আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র হয়ে থাকলে গণতন্ত্রের কোনো লাভ হয় না। সেই প্রতিবেদনে যদি বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন না থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়নে তা কোনো অবদান রাখতে পারে না। অথচ দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় হয় না, কিংবা সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার উদ্যোগও নেওয়া হয় না।

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বও প্রশ্নের বাইরে নয়। পর্যবেক্ষক সংস্থাকে অনুমোদন দেওয়ার সময় তাদের সক্ষমতা, অবকাঠামো, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাই করা জরুরি। কেবল কাগজপত্র পূরণ করলেই কোনো সংস্থাকে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হলে সেটি পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। পর্যবেক্ষক অনুমোদনের ক্ষেত্রে মানদণ্ড যদি কঠোর না হয়, তবে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম নিজেই বিতর্কের জন্ম দেয়।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা সাধারণত দেশের বাইরে থেকে এসে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। দেশের বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট না বুঝে দেওয়া কোনো মন্তব্য বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করতে পারে। তাই দেশীয় পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।

তবে এটাও সত্য, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর নয়। কিছু সংস্থা এবং ব্যক্তি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের প্রতিবেদনে অনেক সময় ভোটকেন্দ্রের বাস্তব চিত্র উঠে আসে। এসব উদ্যোগই দেখায় যে, সঠিক কাঠামো ও সদিচ্ছা থাকলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ গণতন্ত্রের জন্য কার্যকর একটি হাতিয়ার হতে পারে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কি কেবল নির্বাচনের বৈধতা প্রদানের একটি আনুষ্ঠানিক যন্ত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে, নাকি এটি সত্যিকারের জবাবদিহির একটি প্রক্রিয়া হয়ে উঠছে? যদি পর্যবেক্ষণ কেবল সংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে—কে কতজন পর্যবেক্ষক দিল, কতটি কেন্দ্রে উপস্থিত ছিল—তবে সেটি কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। প্রয়োজন গুণগত মানের দিকে নজর দেওয়া।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকে কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পর্যবেক্ষকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ ও পর্যালোচনার একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, পর্যবেক্ষকদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে আর্থিক ও সাংগঠনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

নির্বাচন শুধু ভোট দেওয়ার দিনটুকুর বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। অন্যথায়, পর্যবেক্ষণের নামেই যদি সন্দেহ তৈরি হয়, তবে সেটি গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়, বরং নতুন অনাস্থার জন্ম দেবে।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হতে পারে—যদি তা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হয়। অন্যথায় এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন হয়ে দাঁড়াবে, যা নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই তাই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।