ছোট গল্প: ওরা ঝগড়া ভুলে বন্ধু হলো
মাহবুবা ফারুক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:১১ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
এই পুরোনো বাড়িটাতে এলে সাফল্যর খুব ভালো লাগে। এখানে সাফল্য তার মায়ের সাথে ছোটবেলা থেকেই আসা যাওয়া করে। তাদের বাসাও কাছাকাছিই। এটা তার নানা বাড়ি। নানা-নানী নেই। বাড়িটা দেখে রাখেন নানার পোষ্যকন্যা। যাঁকে সাফল্য খালা হিসেবে জানে। খালা তাকে খুব আদর করেন। মায়ের বকুনি থেকে কত ভাবে যে বাঁচিয়ে দেন তার হিসেব নেই। ভাত মেখে নিজের হাতে মুখে তুলে খাইয়ে দেন। সাফল্য খেতে না চাইলে খালা ভাতগুলোকে মাছ, ডাল,সবজি দিয়ে মেখে- নানা রকম ছোট বড় ডিমের মত করে বানান । তারপর তাকে অনেকগুলো পাখির নাম বলেন। এভাবে কত পাখি যে তার চেনা হয়ে গেছে। সেই পাখিদের নাম বলেন আর একটা করে ডিম দেখান-
: এই যে এটা তোতা পাখির ডিম।
প্লেটের এক পাশে সাজিয়ে রেখে আরেকটা দেখান।
এটা চড়ুই পাখির ডিম।
: ও তাই এটা এত ছোট !
সাফল্য অবাক হয়ে বলে ওঠে। খালা আবার আরো বড় একটা দেখিয়ে মুখে তুলে দিতে দিতে বলেন, এটা কোকিলের ডিম।
এভাবে আনন্দে গপাগপ সবটুকু ভাত খাওয়া হয়ে যায় তার ।
হঠাৎ সাফল্য বলে, ব্যাঙের ডিম বানাতে পারো খালা?
: হ্যাঁ পারি । কাল ব্যাঙের ডিম বানিয়ে খাওয়াবো। আজ সন্ধ্যে হয়ে গেছে । বাসায় মা চিন্তা করবে। চলে যাও।
: না । আমি তোমাদের এখানে থাকবো।
ওর কথা শুনে খালা মনে মনে ভাবলেন, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটনা করে এসেছে। মাঝে মাঝে এমন তো করে। জিজ্ঞেস করলেন, বাবা সাফলু, আজকে স্কুলে কিছু হয়েছে?
সাফল্যর ভাতের থালাটা নিয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছেন খালা। তাঁর আঁচলটা ধরে সে- ও গেল। পিঁড়ি টেনে খালা বসেন। সাফল্যও গায়ের সঙ্গে মিশে বসে।
খালার বুঝতে আর বাকি নেই যে কিছু একটা ঘটেছে আজ।
: বলো বাবা কি হয়েছে ?
: তাহলে আমাকে চলে যেতে বলো না ? তোমার কাছে আমি থেকে যাব । বলো, বলো এখানে আমাকে থাকতে দেবে?
: আচ্ছা বাবা সে নাহয় বুঝলাম। কিন্তু মা নিতে এলে তখন তো যেতে হবে।
: না না না। আমি সন্ধ্যাতেই ঘুমিয়ে যাব। তোমাকে একটুও জ্বালাতন করবো না। তুমি মাকে বলবে, সাফল্য ঘুমিয়ে গেছে।কাল সকালেই দিয়ে আসব।
: মা কি তা মানবে? তোমার স্কুল আছে না কাল?
: তাহলে তুমিও আমার সঙ্গে চলে যাবে। বলো যাবে? বলো?
: আচ্ছা বাবা যাবো। কিন্তু হয়েছেটা কি তা তো বলবে?
সাফল্য মুখটা মলিন করে তাকালো খালার দিকে। খালা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ক্লাস থ্রিতে পড়া ছেলেটার আকুতির কাছে খালা এতটা দুর্বল হয়েছেন যে তিনি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ছেন যেন।
তিনি সাফল্যকে হাত ধরে নিয়ে এলেন শোবার ঘরে। নানীর ঘরটাই এখন খালার শোবার ঘর। বিছানায় বসিয়ে তালপাতার পাখায় বাতাস দিতে লাগলেন। ইলেকট্রিসিটি নেই অনেকক্ষণ থেকে। খালা বললেন, ইশ্! ঘেমে গেছো বাবা।
: আমি, আমি মানে আমার ঝগড়া হয়েছে।
: কার সাথে? কেন?
একটু এদিক ওদিক তাকায় সাফল্য। তারপর বললো, আরে জানো না অতুলটা কী দুষ্টু ! ওই তো গায়ে পড়ে এসে ঝগড়াঝগড়ি বাঁধিয়ে দিল । ঝগড়া করে আবার আম্মুর কাছে বিচারও দিয়ে এলো। তাই খেলার মাঠ থেকে আমি আর বাসায় যাইনি। তোমার কাছে চলে এসেছি। এখন থেকে এখানেই থাকবো।
এমনভাবে কথাগুলো বললো যেন তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
খালা চুপ করে শোনেন।
সাফল্য বলে, আবার সেদিনের মতো যেন ঘুমের মধ্যে দিয়ে এসো না। ভোরবেলা জেগে দেখি আমার রুম, আমার বিছানা। দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। যেই বলেছি, কি হলো আমি এখানে কেন? ওমনি আম্মু বলে, কোনো কথা নেই। সোজা উঠে স্কুলের জন্যে তৈরি হও। আব্বু বলে, তোমার এই অভ্যাসটা ভালো নয়। এভাবে না বলে ওই বাড়ি চলে যাওয়া।
একটু থেমে সাফল্য আবারও বলে, আচ্ছা খালা আমি কি এমনি এমনি আসি? আমার এখানে থাকতে ভালো লাগে তাই আসি। বলো খালা, মানুষের যেখানে ভালো লাগে সে তো সেখানেই থাকবে তাই না ?
ওর কথা শুনে খালা মনে মনে হাসেন। সাফল্যকে বোঝান, তোমার স্কুল তো বাদ দেয়া যাবে না বাবা । এজন্যই আম্মু আব্বু বলেন।
: ঠিক আছে স্কুল বাদ দিব না। এখান থেকেই যাব, এটা বলে তুমি নিয়ে আসো। তোমার কাছে এনে রাখো।
: আচ্ছা বাবা ঝগড়াটা কী নিয়ে হলো বললে না তো?
: ও হ্যাঁ। আমি স্কুলের পিছনের ছোট্ট ডোবাযটায় ব্যাঙ্গাচি দেখছিলাম। ওখানে ব্যাঙের ডিমও আছে। ছোট ছোট অনেকগুলো ডিম একসাথে। অদ্ভুত! আমি জীবনে প্রথম দেখেছি। কেমন যেন সাবানের ফেনার মতো। আর ব্যাঙ্গাচিগুলো বিভিন্ন রকমের। ছোট কতগুলো। তার চেয়ে আরেকটু বড় কিছু। ওরা ডুব দেয়। সাঁতার কাটে। কিলবিল করে। লাফ দেয়। নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। সব ভাইবোন মিলে কেমন যেন খুব মজা করে পানিতে ভেসে ভেসে। ওদের কোনো ঘরও লাগে না। ওরা পানিতেও থাকতে পারে আবার শুকনোতে উঠে ওখানেও থাকতে পারে। অবাক হয়ে দেখছিলাম। তখন হঠাৎ পেছন থেকে অতুল এসে ঢিল ছুঁড়ে মারলো ব্যাঙের উপর। ব্যাঙগুলো ডুব দিয়ে, লাফ দিয়ে সব সরে গেল তখনই। আমার রাগ হয়েছে খুব অতুলের উপর। একটু রাগ করে জোরে বলেছি, এটা করলি কেন?
: এসব কী দেখছিস? কেন দেখছিস ছাই ব্যাঙ? এটা দেখার কী আছে ? পাগল কোথাকার।
আরো জোরে বলে আমিও বলি।
: আমি দেখছি তাতে তোর কি সমস্যা? সে বলল, ওহো ব্যাঙের গায়ে ঢিল দিয়েছি তাতে তোর গায়ে লেগেছে বুঝি? নে তাহলে এই ঢিলটা তোকেই দিলাম। বলে আমার গায়ে ঢিল ছুঁড়ে মারে। দেখো, এই আমার হাত দেখো কিরকম কালো হয়ে ফুলে আছে। ঢিল মেরেই দে ছুট। আমি বলেছি, এখন পালাচ্ছিস কেন? দৌড়ে আমি পিছন থেকে গিয়ে ধরতে চেষ্টা করেছি। অমনি কাদায় পা পিছলে ও ডোবায় পড়ে গেছে। গায়ে কাদা লেগে গেছে। শার্ট ভিজে গেছে। কাদায় মাখামাখি হয়ে সে উঠে আমাকে চোখ বড় বড় করে বলল, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
সোজা আম্মুর কাছে গিয়ে বিচার দিয়ে এলো। তাই আমি আর বাসায় যাইনি। তোমার কাছে চলে এসেছি।
খালা বলেন, মাকে তুমি বুঝিয়ে বললেই হতো।
: এএহ! তুমি বুঝি চেনোনা আম্মুকে । আগে এক জিবি আমাকে উত্তম মাধ্যম দিয়ে নিবে। কিছুই শুনবে না । তারপর আর বুঝিয়ে বলে কি হবে?
খালা মুচকি হাসেন আর কী যেন ভাবেন।
অতুলদের বাড়িও নানার বাসার কাছে। অতুলের মায়ের সাথে খালার খুব ভাব। প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয়। কথা হয় ।
দেরি না করে সাফল্য খেয়েই ঘুমোতে এলো। হঠাৎ দেখে আম্মু এসে হাজির। ইশ ! ঘুমিয়ে গেলে পরে যদি আসতো। ভাবতে ভাবতেই দেখে অতুল আর তার মাও এসে হাজির। কী ব্যাপার! আজ তো মার খেতে খেতে সাফল্য মরেই যাবে। এসব কি ঘটছে? ঘাপটি মেরে খালার কাঁথাটা টেনে নাক মুখ ঢেকে শুয়ে থাকলো।
আম্মু খালাকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে বসেন। খালা এসে অতুলের মাকে আর অতুলকে চেয়ার টেনে বসতে দেন।
খালা কথা বলেন, ঘটনাটা আমি শুনেছি। অতুল বাবা তোমরা তো একসাথে পড়, বন্ধু। তোমাদের কোনো কিছু নিয়ে ঝগড়া হতে পারে। আবার মিটেও যাবে। তাই না? অতুল মাথা নিচু করে বসে থাকে।
অতুলের মা বলেন, আমার ছেলেটার কোনো দোষ নেই। এমনি এমনি ধাক্কা দিয়ে কাদায় ফেলে দিল সাফল্য। তার সামনে যেতেই সে রাগ করে বকাবকিও করছিল।
খালা বলেন, এটা তো একজনের কথা আপা। আরেকজনেরটা একটু শুনি। কাঁথা সরিয়ে ডেকে তোলেন সাফল্যকে। তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে পুরো ঘটনা বলে। সব শুনে অতুল মিন মিন করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখন অতুলের মা বলেন, বল বল বাবা যা সত্যি তা বল।
সাফল্যের মাও বলেন, হ্যাঁ বাবা দুজনেই সত্যিটা বল। তখন সাফল্য বলে, আমারটাই সত্যি- ও আর কি বলবে? বল এখন প্রথমে কে ঝগড়া শুরু করেছিল?
অতুল কথা বলে না। অতুলের মা বুঝতে পারলেন। সাফল্যের আম্মুও বুঝলেন।
খালা কথা বলেন, বাবা অতুল এ কাজটা কি করা তোমার ঠিক হয়েছে? যদি মিথ্যে বিচার দিয়ে বন্ধুকে শাস্তি পাওয়াও তাহলে কি তুমি খুশি হবে? অতুল 'না' সূচক মাথা নাড়ে।
সাফল্যের আম্মু বলেন, গুডবয়। অতুল ভালো ছেলে। তোমরা একসাথে মিলে যাও। মিলেমিশেই থাকবে আর এমন ঝগড়া করবে না।
নিজের ছেলেকে বলেন, সাফল্য যাও ওর সাথে হাত মিলাও। তুমি তাকে ফেলে দিয়ে খুব খারাপ কাজ করেছো।
সাফল্য বলে, আমার ভুল হয়েছে। সরি এমন আর করবো না আর কখনো হবে না।
অতুল বলে, আমিও আর এমন করবো না। মিলেমিশে থাকবো । আমরা তো বন্ধু।
অতুলের মা বলেন, মিথ্যে বলা অন্যায়। কখনো মিথ্যে বলবে না আর। ঝগড়াও করবে না। দুজনের আম্মু দুজনকে হাত মিলিয়ে দিলেন। খালা সবার জন্যে চা আর নিজের হাতে বানানো পিঠা নিয়ে এলেন।
বন্ধুদের মিল হলো। সুন্দর সন্ধ্যায় চাঁদের আলোয় নানার বাড়ির উঠোন ভেসে যাচ্ছে। উঠোনের ওপার থেকে বাতাসে ভেসে আসছে গন্ধরাজ ফুলের ঘ্রাণ। এত সুন্দর গন্ধ তার বুকের ভিতর পর্যন্ত আনন্দে ভরে দিল। হাসিখুশি বাড়ি ফিরছে সাফল্য ও অতুল। সঙ্গে রইল তাদের প্রতিজ্ঞা- মিথ্যে কথা বলবে না ওরা। ঝগড়াও করবে না আর।
ভাবতে ভাবতেই দেখে অতুল আর তার মাও এসে হাজির। কী ব্যাপার! আজ তো মার খেতে খেতে সাফল্য মরেই যাবে ।এসব কি ঘটছে? ঘাপটি মেরে খালার কাঁথাটা টেনে নাক মুখ ঢেকে শুয়ে থাকলো।
আম্মু খালাকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে বসেন। খালা এসে অতুলের মাকে আর অতুলকে চেয়ার টেনে বসতে দেন।
খালা কথা বলেন, ঘটনাটা আমি শুনেছি। অতুল বাবা তোমরা তো একসাথে পড়, বন্ধু। তোমাদের কোনো কিছু নিয়ে ঝগড়া হতে পারে। আবার মিটেও যাবে। তাই না? অতুল মাথা নিচু করে বসে থাকে। অতুলের মা বলেন, আমার ছেলেটার কোনো দোষ নেই। এমনি এমনি ধাক্কা দিয়ে কাদায় ফেলে দিল সাফল্য। তার সামনে যেতেই সে রাগ করে বকাবকিও করছিল।
খালা বলেন, এটা তো একজনের কথা আপা। আরেকজনেরটা একটু শুনি। কাঁথা সরিয়ে ডেকে তোলেন সাফল্যকে। তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে পুরো ঘটনা বলে। সব শুনে অতুল মিন মিন করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। তখন অতুলের মা বলেন, বল বল বাবা যা সত্যি তা বল।
সাফল্যের মাও বলেন, হ্যাঁ বাবা দুজনেই সত্যিটা বল । তখন সাফল্য বলে, আমারটাই সত্যি- ও আর কি বলবে? বল এখন প্রথমে কে ঝগড়া শুরু করেছিল?
অতুল কথা বলে না। অতুলের মা বুঝতে পারলেন। সাফল্যের আম্মুও বুঝলেন।
খালা কথা বলেন, বাবা অতুল এ কাজটা কি করা তোমার ঠিক হয়েছে? যদি মিথ্যে বিচার দিয়ে বন্ধুকে শাস্তি পাওয়াও তাহলে কি তুমি খুশি হবে? অতুল মাথা নাড়ে 'না' সূচক।
সাফল্যের আম্মু বলেন ,গুডবয় । অতুল ভালো ছেলে। তোমরা একসাথে মিলে যাও। মিলেমিশেই থাকবে আর এমন ঝগড়া করবে না। নিজের ছেলেকে বলেন, সাফল্য যাও ওর সাথে হাত মিলাও। তুমি তাকে ফেলে দিয়ে খুব খারাপ কাজ করেছো। সাফল্য বলে , আমার ভুল হয়েছে। সরি এমন আর করবো না আর কখনো হবে না।
অতুল বলে আমিও আর এমন করবো না। মিলেমিশে থাকবো। আমরা তো বন্ধু।
অতুলের মা বলেন, মিথ্যে বলা অন্যায়। কখনো মিথ্যে বলবে না আর। ঝগড়াও করবে না। দুজনের আম্মু দুজনকে হাত মিলিয়ে দিলেন। খালা সবার জন্যে চা আর নিজের হাতে বানানো পিঠা নিয়ে এলেন।
বন্ধুদের মিল হলো। সুন্দর সন্ধ্যায় চাঁদের আলোয় নানার বাড়ির উঠোন ভেসে যাচ্ছে। উঠোনের ওপার থেকে বাতাসে ভেসে আসছে গন্ধরাজ ফুলের ঘ্রাণ। এত সুন্দর গন্ধ তার বুকের ভিতর পর্যন্ত আনন্দে ভরে দিল। হাসিখুশি বাড়ি ফিরছে সাফল্য ও অতুল। সঙ্গে রইল তাদের প্রতিজ্ঞা- মিথ্যে কথা বলবে না ওরা। ঝগড়াও করবে না আর।
