১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন: চায়ের কাপে ভোটের উত্তাপ
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:২৮ এএম, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে নির্বাচন। দিন যত এগোচ্ছে, ততই রাজনীতি নেমে আসছে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায়। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান, অফিসের ক্যান্টিন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা গ্রামের হাট—সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রে এখন ভোট।
সকালের দিকে শহরের পুরোনো এক চায়ের দোকানে ঢুকতেই বোঝা যায়, নির্বাচনের উত্তাপ কতটা ছড়িয়ে পড়েছে। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ আর তরুণ শিক্ষার্থীরা বসে আছেন বেঞ্চে। কাপে কাপে চা উঠছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে উঠছে নানা হিসাব–নিকাশ।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল করিম বলেন, আগের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে মানুষ এবার বেশি সচেতন। কে কী বলছে, কে কী করছে—সবাই খেয়াল করছে।
তার পাশে বসা এক তরুণ ভোটার বলেন, আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু তার সঙ্গে চাই নিরাপত্তা আর কাজের সুযোগ। শুধু পোস্টার–মাইক দিয়ে ভোট পাওয়া যাবে না।
চায়ের দোকানের এই ছোট পরিসরের আলোচনায় উঠে আসছে বড় বড় জাতীয় ইস্যু—দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। কেউ সরকারের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, কেউ বিরোধিতা করছেন। তর্কের মধ্যেও আছে প্রত্যাশা—ভোটের মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা।
রিকশাচালক সেলিম বলেন, আমাদের রাজনীতি মানে পেটের চিন্তা। চাল–ডাল–তেলের দাম কমলে বুঝবো সরকার ভালো।
এই কথাতেই ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বোধ—বড় বড় স্লোগানের চেয়ে জীবনযাত্রার বাস্তবতা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুপুরের দিকে স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানে বসে কথা হয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তাদের আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচনের পর বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা।
একজন বলেন, ভোটের আগে সবাই আশ্বাস দেয়। ভোটের পরে সেই আশ্বাস কতটা থাকে, সেটাই বড় প্রশ্ন। একজন বললেন, ভোটের পর বাজার কী হবে, সেটাই এখন ভাবছি। আরেকজনের কণ্ঠে আশা, নতুন সরকার এলে হয়তো পরিস্থিতি একটু ভালো হবে।
শহরের বাইরের গ্রামগুলোতেও চিত্র আলাদা নয়। হাটের কোণায় দাঁড়িয়ে কৃষকরা কথা বলছেন সারের দাম, ফসলের ন্যায্যমূল্য আর বিদ্যুতের বিল নিয়ে। তাদের কথায় রাজনীতি কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং জীবিকার সঙ্গে জড়ানো বাস্তব প্রশ্ন।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, চায়ের দোকানের এই আলাপ আসলে দেশের রাজনৈতিক আবহের প্রতিফলন। নির্বাচন সামনে এলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। এই আলোচনাগুলোই নির্ধারণ করে ভোটের মানসিক প্রস্তুতি।
তাদের মতে, চায়ের কাপে যে কথাবার্তা চলে, সেটি কেবল আড্ডা নয়; এটি গণতান্ত্রিক চর্চার একটি অনানুষ্ঠানিক রূপ। এখানে মানুষ প্রশ্ন তোলে, তুলনা করে, মত প্রকাশ করে—যা একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে।
নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শান্তিপূর্ণ ভোটের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। তবে মানুষের আলোচনায় এখনো ভরসা আর শঙ্কা—দুটোই আছে।
চায়ের কাপে কাপে চলা এই কথোপকথনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের আশা–ভরসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কারো কাছে এটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা, কারো কাছে আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
১২ ফেব্রুযারি ভোট শেষ হলে ফলাফল নির্ধারিত হবে ব্যালট বাক্সে। কিন্তু তার আগেই দেশের প্রতিটি চায়ের দোকানে যে আলোচনা চলছে, সেটিই বলে দিচ্ছে—রাজনীতি মঞ্চে নয়, সবচেয়ে বেশি বাস করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
