পাখির দেশে বাংলাদেশ: বৈচিত্র্য, আবাসস্থল ও সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জ
রাতুল মাঝি
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০২:৩১ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সোমবার
ছবি: সংগ্রহিত।
নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, হাওর-বাঁওড়, বনভূমি ও বিস্তৃত কৃষিজমির কারণে বাংলাদেশ পাখির জন্য এক অনুকূল আবাসস্থল। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৭৫০ প্রজাতির পাখি শনাক্ত হয়েছে বলে পক্ষীবিদদের তথ্য। এর মধ্যে দেশীয়, পরিযায়ী ও পথপরিযায়ী—এই তিন শ্রেণির পাখিই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখি-অভয়াশ্রম। শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশের হাওর, বিল ও জলাভূমিতে আসে।
দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি
বাংলাদেশের পরিচিত দেশীয় পাখির মধ্যে রয়েছে দোয়েল, শালিক, কাক, কোকিল, ঘুঘু, বক ও মাছরাঙা। এর পাশাপাশি শীতকালে আসে পাতিহাঁস, গাঙ্গচিল, সরালি হাঁস, পানকৌড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির চিল-ঈগল।
পরিযায়ী পাখিরা সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আসতে শুরু করে এবং মার্চ-এপ্রিলের দিকে ফিরে যায়।
জাতীয় পাখি দোয়েল
দোয়েল বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। শহর ও গ্রাম—দুই পরিবেশেই এই পাখি দেখা যায়। মানুষের বসতঘেঁষা এলাকায় থাকার কারণে দোয়েল বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।
আবাসস্থল ও খাদ্যচক্র
পাখির প্রধান আবাসস্থল হচ্ছে বনাঞ্চল, হাওর, বিল, নদী-নালা ও উপকূলীয় চর। এসব এলাকায় তারা খাদ্য সংগ্রহ করে ও বংশবিস্তার করে।
পাখিরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষি জমি রক্ষা করে, গাছের বীজ ছড়িয়ে বনভূমির বিস্তারে সহায়তা করে এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
হুমকির মুখে পাখি
তবে দিন দিন বাংলাদেশের পাখি বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে অনেক পাখির আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।
এ ছাড়া অবৈধ শিকার ও ফাঁদ পেতে পাখি ধরাও বড় সমস্যা। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখি শিকারের ঘটনা বাড়ে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
আইন ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী পাখি শিকার ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও পরিবেশবাদী সংগঠন পাখি সংরক্ষণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে।
কয়েকটি হাওর ও বনাঞ্চলকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে শিকার নিষিদ্ধ।
পাখি ও মানুষের সম্পর্ক
গ্রামীণ জীবনে পাখির ডাক ভোরের বার্তা বহন করে। শহরে ব্যস্ত জীবনের মাঝেও পাখির কূজন মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। পাখি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, মানুষের সংস্কৃতি ও সাহিত্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
পক্ষীবিদদের মতে, পাখি রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা। তারা বলছেন, জলাভূমি সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং শিকার বন্ধ করা গেলে পাখির সংখ্যা আবার বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ পাখির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসভূমি হলেও মানবসৃষ্ট নানা চাপে এই সম্পদ আজ সংকটের মুখে। পাখি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।#
