ঢাকা, বুধবার ১৮, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৫:৪৫:১৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

নারীরা শুধু ভোটার হয়ে যাবে, এটা কি লজ্জার নয়?

উম্মুল ওয়ারা সুইটি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:২৩ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

উম্মুল ওয়ারা সুইটি

উম্মুল ওয়ারা সুইটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে-নারীরা কি কেবল ভোটার হিসেবেই গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য, নাকি নীতিনির্ধারক হিসেবেও তাদের জায়গা নিশ্চিত হবে? সরাসরি নির্বাচনে মাত্র ৭ জন নারী বিজয়ী। সংরক্ষিত ৫০ আসন যোগ হলেও সম্ভাব্য নারী প্রতিনিধিত্ব ১৬ শতাংশের বেশি নয়। সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়না।

১. ইতিহাসের ধারায় নারী প্রতিনিধিত্ব!

বাংলাদেশের প্রথম সংসদে নারী ছিলেন কেবল সংরক্ষিত আসনে। দ্বিতীয় সংসদে ২ জন সরাসরি নির্বাচিত হলেও দীর্ঘ সময় নারী প্রতিনিধিত্ব ছিল প্রতীকী। নবম সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী ২১ জন—একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা টেকেনি। ত্রয়োদশ সংসদে সংখ্যা নেমে এসেছে ৭-এ।

অর্থাৎ, প্রায় আড়াই দশক পর আমরা আবার এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছি, যেখানে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ‘ব্যতিক্রম’—স্বাভাবিক বাস্তবতা নয়।

২. ভোটার বনাম প্রার্থী: বৈষম্যের ফাঁদ

বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। অনেক আসনে নারী ভোটার সংখ্যায় পুরুষকে ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু মনোনয়নে নারীরা প্রায় ২২ গুণ পিছিয়ে।রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও প্রার্থী বাছাইয়ের সময় পুরুষ-প্রাধান্যই বাস্তবতা। ৫ শতাংশ মনোনয়নের অঙ্গীকারও পূরণ হয়নি। ফলে নারীরা প্রতিযোগিতার মাঠেই নামতে পারেন না।
প্রশ্ন হলো—যখন মাঠেই নামার সুযোগ কম, তখন জয়ের হার কম হলে দায় কার?

৩. নারীবিদ্বেষী প্রচারণা: অদৃশ্য প্রাচীর

এবারের নির্বাচনে একাধিক নারী প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, পারিবারিক পরিচয়—সবকিছু নিয়েই কটাক্ষ হয়েছে।

রাজনীতিতে পুরুষের আগ্রাসী ভাষা ‘স্বাভাবিক’ ধরা হলেও নারীর দৃঢ়তা ‘অহংকার’ বলে চিহ্নিত হয়। এই সামাজিক মানসিকতা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলে।নারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার খর্ব করার কৌশল।

৪. সংরক্ষিত আসন: ক্ষমতায়ন নাকি সীমাবদ্ধতা?

সংরক্ষিত আসন নারীদের সংসদে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। নবম সংসদে সংরক্ষিত আসন ৫০-এ উন্নীত হওয়ায় মোট নারী এমপি ৭০ জনে পৌঁছেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—সংরক্ষিত আসন কি নারীদের ‘দ্বিতীয় সারির’ রাজনীতিক বানিয়ে রাখছে? সরাসরি নির্বাচনের রাজনৈতিক লড়াই, তৃণমূল সংগঠন, জনসংযোগ—এসবের অভিজ্ঞতা ছাড়া কি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব তৈরি সম্ভব?

৫. তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলার ঘাটতি

রাজনীতিতে নারী অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে কেবল নির্বাচন-পূর্ব মনোনয়ন নয়, পাঁচ বছরব্যাপী প্রস্তুতি দরকার। স্থানীয় সরকারে নারীর কার্যকর ভূমিকা।দলীয় কমিটিতে বাধ্যতামূলক নারী নেতৃত্ব। রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা এবং আর্থিক সহায়তা ও ক্যাম্পেইন ফান্ডিং।এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া প্রতি নির্বাচনে একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসবে।

৬. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: আমরা কোথায়?

বিশ্বের অনেক দেশে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩০–৪৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশেও কোটা ও দলীয় বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে এই হার বেড়েছে।বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা—এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও সংসদে নারীর সামগ্রিক উপস্থিতি এখনও নিম্ন। শীর্ষ নেতৃত্বে নারী থাকা মানেই তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত নয়—এ বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে।

৭. ভোটার থেকে নীতিনির্ধারক: রূপান্তরের পথ

নারীরা শুধু ভোটার হয়ে থাকবে—এ ধারণা বদলাতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি:
১. মনোনয়নে ন্যূনতম ১৫–২০% বাধ্যতামূলক কোটা
২. নারীবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি
৩. দলীয় তহবিলে নারী প্রার্থীর জন্য আলাদা বরাদ্দ
৪. মিডিয়ায় ইতিবাচক উপস্থাপন ও রোল মডেল তৈরি
৫. শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা কর্মসূচি

গণতন্ত্র কেবল ভোটের সংখ্যায় নয়, প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্যে শক্তিশালী হয়। যদি অর্ধেক জনগোষ্ঠী কেবল ভোটার হিসেবেই থেকে যায়, তবে সংসদ কখনোই সমাজের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি হবে না।
ত্রয়োদশ সংসদের ৭ জন সরাসরি নির্বাচিত নারী আমাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে—অগ্রগতি স্বয়ংক্রিয় নয়, তা অর্জন করতে হয়।
নারীরা কি শুধু ভোটার হয়েই থাকবে? নাকি আগামী নির্বাচনে তারা আরও বড় সংখ্যায় নীতিনির্ধারক হিসেবে উঠে আসবে?
উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সমাজের মানসিকতার ওপর। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রতীকী রাখব, নাকি বাস্তব ক্ষমতায়নে রূপ দেব?

উম্মুল ওয়ারা সুইটি: সিনিয়র সাংবাদিক।