সমাধিতে ভাষার ইতিহাস: আজিমপুর কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছেন ভাষা শহীদরা
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:১২ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
ভাষা শহিদ আবদুল জব্বারের সমাধী। আজিমপুর পুরোনো কবরস্থান। ঢাকা।
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল পেরিয়ে আজিমপুরের পুরোনো কবরস্থানে পা রাখলেই সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। শহরের কংক্রিট আর শব্দের ভিড়ের আড়ালে এখানে শুয়ে আছেন ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া সেই মানুষগুলো—যাঁদের রক্তে লেখা হয়েছিল বাংলার অধিকার।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল তরুণ ছাত্রসমাজ। পুলিশের গুলিতে ঝরে যায় তাজা প্রাণ। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত দিনে শহীদ হন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, রফিক উদ্দিন আহমেদ ও আবদুস সালাম।
এই শহীদদের কয়েকজনের চিরনিদ্রার স্থান আজ আজিমপুর কবরস্থান। বিশেষ করে শহীদ আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও শফিউর রহমানের কবর এখানে অবস্থিত বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই কবরস্থান।
প্রতিটি কবর যেন এক একটি স্তব্ধ দলিল। পাথরের ফলকে লেখা নামের নিচে চাপা পড়ে আছে তরুণ বয়সের স্বপ্ন, অসমাপ্ত জীবন আর একটি জাতির ভাষার আকাঙ্ক্ষা। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়—এই নীরবতা কোনো সাধারণ নীরবতা নয়, এ নীরবতা প্রতিবাদের, এ নীরবতা ভাষার অধিকারের।
একজন প্রবীণ দর্শনার্থী বলেন,
“এখানে এসে কবরের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, এরা শুধু মারা যাননি—এরা বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে গেছেন।”
ভাষা শহীদদের এই সমাধিস্থল কেবল কবরস্থান নয়, এটি এক ধরনের জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ। এখানে লেখা নেই কোনো দীর্ঘ বিবরণ, নেই কোনো উচ্চস্বরে ভাষণ—তবু প্রতিটি কবর চিৎকার করে বলে,
‘ভাষার জন্য জীবন দিলে জাতি বাঁচে।’
প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে শহীদ মিনারের পাশাপাশি আজিমপুর কবরস্থানেও আসে মানুষ। ফুল হাতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ মানুষ। কেউ ফিসফিস করে বলে ওঠে—
“তোমাদের রক্তেই তো আমি আজ বাংলায় কথা বলি।”
বাংলা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবে বিশ্বময় উচ্চারিত। কিন্তু এই অর্জনের শুরু হয়েছিল এখান থেকেই—আজিমপুরের নিঃশব্দ কবরগুলোর ভেতর শুয়ে থাকা সেই ত্যাগের বীজ থেকে।
ঢাকার এই পুরোনো কবরস্থান তাই শুধু মৃত্যুর ঠিকানা নয়;
এটি ভাষার জন্মভূমির এক নীরব প্রহরী।
এখানে শুয়ে থাকা শহীদরা যেন আজও পাহারা দিচ্ছেন—
বাংলা যেন কখনো আর অবহেলিত না হয়,
মাতৃভাষা যেন কখনো আর রক্তে রাঙাতে না হয়।
