ভাষা আন্দোলনের নীরব সাহস: ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন
ট্রেশো জফি
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:৪৬ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে যেমন ছিল তরুণ ছাত্রদের দৃপ্ত উপস্থিতি, তেমনি আড়ালে থেকে সংগঠন, আশ্রয় ও সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করেছিলেন অনেক নারী। তাঁদেরই একজন ছিলেন ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন। সরাসরি মিছিলে না থাকলেও আন্দোলনের প্রস্তুতি, যোগাযোগ ও সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে ভাষা আন্দোলনের গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলনের সময়ে ছাত্রদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, গোপনে লিফলেট সংরক্ষণ এবং সভা-সমাবেশের খবরে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে সক্রিয় ছিলেন হালিমা খাতুন। তৎকালীন দমন-পীড়নের ভীতিকর পরিবেশে এসব কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় তিনি সেই ঝুঁকি নিতে পিছপা হননি। তিনি নানা সময় মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় নারীদের রাজপথে অংশগ্রহণ ছিল সামাজিকভাবে কঠিন। সে বাস্তবতায় হালিমা খাতুনের মতো নারীদের ভূমিকা আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, আন্দোলনের সংগঠন কাঠামোর একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে ছিল এসব নীরব কর্মীর ওপর, যাঁদের নাম সংবাদপত্রে বা সরকারি নথিতে তেমনভাবে উঠে আসেনি।
পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণমূলক লেখায় হালিমা খাতুনের অবদানকে “আড়ালের শক্তি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভাষার জন্য তাঁর সেই সময়ের সাহসী অবস্থান পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পথও প্রশস্ত করেছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি যখন শহীদদের রক্তের গল্প শোনায়, তখন সেই ইতিহাসের আরেকটি স্তরে দাঁড়িয়ে আছেন হালিমা খাতুনের মতো ভাষা সৈনিকরা—যাঁরা রক্ত দেননি, কিন্তু জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে ভাষাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব নেন ২০১৯ (মরণোত্তর) একুশে পদক প্রাপ্ত ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন।
হালিমা খাতুনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৫ আগস্ট। তিনি জন্মগ্রহণ করেন বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়াপাড়া গ্রামে।তাঁর বাবা মৌলবী আব্দুর রহিম শেখ ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মা দৌলতুন নেসা ছিলেন গৃহিনী।
হালিমা খাতুনের প্রথম শিক্ষার হাতেখড়ি হয় বাদেকাড়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে। এরপর ১৯৪৭ সালে মনমোহিনী গার্লস স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। তিনি এইসএসসি ও বিএ পাস করেন বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে।
হালিমা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন।এখানেই তিনি তাঁর জ্ঞান অন্বেষণ থামিয়ে রাখেননি। পরবর্তীতে তিনি প্রাথমিক শিক্ষার ওপর পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। শিক্ষকতা করেছেন খুলনা করোনেশন স্কুল, আরকে গার্লস কলেজ এবং রাজশাহী গার্লস কলেজে। পরে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-এ। এখান থেকেই ১৯৯৭ সালে তিনি অবসরে যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই তিনি ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনের সময় হলের মেয়েদের সাথে নিয়ে আহত ভাষা সৈনিকদের সহযোগিতার জন্য চাঁদা তুলেছেন তিনি। এছাড়া লিফলেট বিলি, পোস্টার লেখার দায়িত্বও পালন করেছেন ওই সময়। ভাষা সংগ্রামের প্রায় সব মিছিল-মিটিংয়েই তিনি অংশগ্রহণ করতেন।
ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই অবদানের জন্য শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন ভাষা সৈনিক সম্মাননা। এছাড়া পেয়েছেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কারসহ আরো নানা পুরস্কার।
উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর ২০১৮ সালের ৩ জুলাই মারা যান ভাষা সৈনিক হালিমা খাতুন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁদের এই অবদান ইতিহাসের মূল স্রোতে জায়গা না পেলেও, ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ চিত্রে তা অপরিহার্য অংশ হয়েই থাকবে।
