নারী ভাষা সৈনিকরা আজও অবহেলিত
নন্দিতা রহমান
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:২০ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
প্রতীকী ছবি।
একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সাধারণত লেখা হয় রক্ত, প্রতিবাদ আর শহীদদের সাহসের গল্পে। কিন্তু সেই ইতিহাসের অদৃশ্য অংশে রয়েছেন অসংখ্য নারী—যাঁরা রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েননি, তবু মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় নীরব প্রতিরোধ, সংগঠন ও সাহস প্রদর্শন করেছেন। তারা ছিলেন শিক্ষক, ছাত্রী, লেখিকা, শিক্ষানুরাগী মা—তাঁদের কণ্ঠের চেয়ে কাজের নীরবতা ছিল প্রগাঢ়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আমরা সাধারণত ছাত্র এবং শহীদদের মুখ্য চরিত্র হিসেবে দেখি। অথচ আন্দোলনের নেপথ্যে কাজ করা নারী সৈনিকরা ছিলেন সেই সংগ্রামের “অদৃশ্য শক্তি”—যাঁরা পিকেটিং, সভা আয়োজন, আহতদের চিকিৎসা, লিফলেট বিতরণ এবং আন্দোলনকারীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। রওশন আরা বাচ্চু, মমতাজ বেগম, সুফিয়া আহম্মদ, ডঃ শাফিয়া খাতুন, হামিদা রহমান, ডা. কাজী খালেদা খাতুন, ড. হালিমা খাতুনসহ অসংখ্য নারী সেই সময় নিজেকে বিপদের মুখোমুখি করেছিলেন। তাঁদের সাহসের কাছে কেবল অভিনন্দন জানানো যথেষ্ট নয়—তাঁদের গল্পের মর্যাদা ইতিহাসের মূল স্রোতে অমর করা প্রয়োজন।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজও আমরা তাদের অনেকের নাম ভুলে গেছি, অনেকের অবদান ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাই না। একুশের শহীদদের কথা স্মরণে প্রতিটি বছর আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হয়, মঞ্চে ভাষা বক্তৃতা হয়, পতাকা উত্তোলন হয়। কিন্তু সেই স্মৃতিচারণে নারী ভাষা সৈনিকদের অবদান প্রায়শই আড়ালেই থাকে। তাঁরা ছিলেন মিছিলে না থাকলেও আন্দোলনের প্রাণশক্তি, এবং তাঁদের নিষ্ঠা ও ত্যাগ বাংলা ভাষাকে জীবিত রেখেছে।
সমাজের এই অবহেলার কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পৌঁছায় না। তারা জানে না, রাষ্ট্রভাষা বাংলা আজ যেভাবে প্রতিষ্ঠিত, তার পেছনে ছিল নারীদের নিরব, আত্মত্যাগী শ্রম। যারা কাঁদুনে গ্যাস, পুলিশের লাঠি, গ্রেফতার ও হুমকির মধ্যে থেকেও লড়াই করেছেন। যারা ইতিহাসের মুখে নীরব থেকেও মাতৃভাষার স্বাধীনতার শক্ত ভিত্তি গড়েছেন।
আজকের দিনে আমাদের দায়িত্ব শুধু শহীদদের স্মরণ করা নয়; বরং সেই আন্দোলনের নীরব সাহসী নারী সৈনিকদের পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। তাঁদের গল্প, সংগ্রাম ও অবদানকে ইতিহাসের মূল স্রোতে স্থায়ী করতে হবে। যে সমাজ নিজের ইতিহাসকে সমন্বিতভাবে জানে না, সে সমাজের ভবিষ্যতও অসম্পূর্ণ থাকে।
নারী ভাষা সৈনিকরা শুধুই অতীতের গল্প নয়—তাঁরা অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁদের অবদান অবহেলা থেকে মুক্ত করতে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি যেন শুধু রক্তের ইতিহাস নয়, সাহস, ত্যাগ ও নারীর সংগ্রামের প্রতীকও হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম—সকলের দায়িত্ব তাদের কৃতিত্বকে সমান মর্যাদা দেওয়া।
নারী ভাষা সৈনিকরা আজও অবহেলিত। কিন্তু ইতিহাস তাদের নাম ভুলবে না, যদি আমরা ভুলতে না দেই। তাঁদের নীরব সাহস এবং সংগ্রাম আমাদের সবসময় মনে রাখার যোগ্য।
