রোজায় বাড়তি খরচ, হিমশিম খাচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ
স্বাধীন আহমেদ
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:০৩ এএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
রমজানের ভোরে সাহ্রির জন্য বাজারে বের হন রিকশাচালক আবদুল কুদ্দুস। দুই কেজি আলু, আধা কেজি পেঁয়াজ, কিছু ডাল আর এক প্যাকেট খেজুর কিনতেই পকেট হালকা হয়ে যায়।
দোকান থেকে বেরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “আগে এই টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো। এখন দুই দিনেরও না।”
রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পুরোনো বাস্তবতা এবারও বদলায়নি। বরং এ বছর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আরও তীব্রভাবে আঘাত করেছে নিম্নআয়ের মানুষকে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আলু, ছোলা, খেজুর—সবকিছুর দামই আগের মাসের তুলনায় বেশি।
বাজারে ঢুকলেই দুশ্চিন্তা
রাজধানীর এক কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতারা দরদাম করে ক্লান্ত। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি নিচ্ছেন, কেউ তালিকা থেকে একাধিক পণ্য বাদ দিচ্ছেন।
গৃহকর্মী শিউলি বেগম বলেন, “রমজান মানেই তো ইফতার। কিন্তু এখন ছোলা-মুড়িও ঠিকমতো কেনা যায় না। বাচ্চাদের মুখে তাকিয়ে লজ্জা লাগে।”
তার মাসিক আয় ৮ হাজার টাকা। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল আর নিত্যখরচ মিটিয়ে খাবারের জন্য থাকে খুব সামান্য। আগে ইফতারে মাঝে মধ্যে বেগুনি বা আলুর চপ বানাতেন। এখন সেটাও বিলাসিতা হয়ে গেছে।
ইফতারের টেবিলে কাটছাঁট
নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে ইফতারের মেনু বদলে গেছে। আগে যেখানে ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু, ফল আর শরবত থাকত—এখন সেখানে শুধু মুড়ি আর একটু ছোলা।
ভ্যানচালক রহিম উদ্দিন বলেন, “আগে সপ্তাহে এক দিন মাংস কিনতাম। এখন মাসেও এক দিন হয় না। রোজার মাসে খরচ তো কমার কথা, উল্টো বাড়ছে।”
কেন বাড়ছে দাম?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি খরচ, পরিবহন ব্যয় আর পাইকারি বাজারের দামের প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। আবার ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান এলেই এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সুযোগ নেয়।
ভোক্তারা বলছেন, “রমজান আসার আগেই যদি নজরদারি বাড়ানো হতো, তাহলে এই অবস্থায় পড়তে হতো না।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়াই দাম বাড়ার মূল কারণ।
স্বল্প আয়ে রোজার হিসাব মেলে না
নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একজন দিনমজুর মাসে গড়ে আয় করেন ১০–১২ হাজার টাকা। অথচ শুধু খাবারের পেছনেই খরচ চলে যায় তার বড় অংশ।
এককথায়, রোজা রাখতে গিয়ে অনেক পরিবারকে
– পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হচ্ছে
– ফলমূল কেনা কমিয়ে দিতে হচ্ছে
– শিশুদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না
এতে দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
রোজা, কিন্তু স্বস্তি নেই
রমজান সংযমের মাস। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠছে দুশ্চিন্তার মাস। ইফতারের সময় পরিবারের সবাই বসে একসঙ্গে খেতে পারলেও মনটা থাকে ভারী।
গার্মেন্টশ্রমিক রাশেদা বেগম বলেন, “রোজা রাখি আল্লাহর জন্য। কিন্তু বাজারে গেলে মনে হয়, রোজা রাখা না রাখা—সবই টাকার ওপর।”
কী চান সাধারণ মানুষ
নিম্নআয়ের মানুষের প্রত্যাশা খুব সাধারণ—নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, বাজারে নিয়মিত তদারকি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ ও খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি বাড়ানো।
তাঁদের ভাষায়, “রমজান মানে যেন শুধু ধৈর্যের পরীক্ষা না হয়, একটু স্বস্তিও চাই।”
রমজান মানে সংযম, সহমর্মিতা আর ভাগাভাগির শিক্ষা। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে সেই শিক্ষাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো যখন শুধু পেট ভরানোর চিন্তায় দিন কাটায়, তখন রমজানের আধ্যাত্মিক আনন্দ তাদের কাছে ম্লান হয়ে যায়।
রমজান যেন কেবল ধনীদের টেবিলে বৈচিত্র্য না আনে, বরং গরিবের হাঁড়িতেও একটু স্বস্তি আনে—এই প্রত্যাশাই এখন নিম্নআয়ের মানুষের।
