রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ: অগ্রগতি, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ পথচলা
আসমা জেরিন
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:১৬ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার
প্রতীকী ছবি।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অংশগ্রহণ। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ যদি সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারীদের ক্ষেত্রে সীমিত থাকে, তবে গণতন্ত্রও হয়ে পড়ে অসম্পূর্ণ। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ তাই কেবল নারী অধিকার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার গুণগত মানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনও তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব গড়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এখনও পুরুষ-প্রধান রাজনীতির কাঠামোই অধিকাংশ দেশে বিদ্যমান।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর উপস্থিতি বাড়লে সামাজিক খাত—বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু ও নারী কল্যাণ—বিষয়ে নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে নারী নেতৃত্ব বেশি, সেখানে দুর্নীতির মাত্রা তুলনামূলক কম এবং সামাজিক ব্যয় বেশি কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ইতিহাস একদিকে গৌরবের, অন্যদিকে বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে নারী নেতৃত্বের নজির রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা এখনও খুবই সীমিত।
সংবিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা থাকলেও তা মূলত মনোনয়ননির্ভর। ফলে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। এতে করে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আংশিক হলেও কাঠামোগত সমতা অর্জিত হয় না।
কেন রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি
১. প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা
নারীরা সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী। অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ অর্ধেকের ধারেকাছেও নয়। এটি প্রতিনিধিত্বের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
২. নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য
নারীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হলে পরিবার, মাতৃত্ব, কর্মজীবন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলো অধিক গুরুত্ব পায়। ফলে রাষ্ট্রীয় নীতি আরও মানবিক ও বাস্তবসম্মত হয়।
৩. গণতন্ত্রের গুণগত উন্নয়ন
নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতা বাড়ে—যা সংঘাতপ্রবণ রাজনীতিকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীল করে।
বাধাসমূহ
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক।
পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা: রাজনীতিকে এখনো ‘পুরুষের ক্ষেত্র’ হিসেবে দেখা হয়।
নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা: নির্বাচনী সহিংসতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নারীদের রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করে।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, যা অধিকাংশ নারীর নাগালের বাইরে।
দলীয় কাঠামোয় সীমাবদ্ধতা: রাজনৈতিক দলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
সংরক্ষিত আসন: সমাধান না সীমাবদ্ধতা?
সংরক্ষিত আসন নারীর উপস্থিতি বাড়ালেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ এতে নারীরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। ফলে রাজনৈতিক বৈধতা ও শক্ত অবস্থান তৈরি হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে নারীদের মনোনয়ন বাড়ানোই হবে টেকসই সমাধান।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলে কোটা পদ্ধতি চালু করে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আফ্রিকার কিছু দেশে সংবিধানেই নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে সংসদে নারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এবং নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা দৃশ্যমান হয়েছে।
করণীয় কী
১. দলীয় পর্যায়ে সংস্কার
রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
২. সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়ন বৃদ্ধি
সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে নারীদের মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
৩. রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশ
নারী কর্মীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি দরকার, যাতে তারা তৃণমূল থেকে নেতৃত্বে উঠতে পারেন।
নিরাপত্তা ও সহায়ক পরিবেশ
নির্বাচনী সহিংসতা কমাতে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি, যাতে নারীরা নির্ভয়ে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন।
উপসংহার
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়—এটি একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের প্রতীকী উপস্থিতি থাকলেও কাঠামোগত অংশগ্রহণ এখনও দুর্বল। প্রকৃত অর্থে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন তারা কেবল সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধি নয়, বরং জনগণের ভোটে নির্বাচিত নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো মানে কেবল নারীকে এগিয়ে দেওয়া নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক করে তোলা। তাই এই প্রশ্ন কেবল নারীর নয়—এটি পুরো জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
আসমা জেরিন: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
