ঢাকা, শনিবার ২৮, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৬:৩০:২৩ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

জলাভূমির লাজুক বাসিন্দা আমাদের ডাহুক পাখি

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:৪১ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ভোরের কুয়াশা ভেজা হাওয়ায় হঠাৎ শোনা যায় একটানা কর্কশ ডাক—“ডা-হুক… ডা-হুক…” এই ডাক শুনেই গ্রামবাংলার মানুষ বুঝে নেয়, কাছের বিল বা ঝিলের ধারে লুকিয়ে আছে ডাহুক পাখি। জলজ পরিবেশের এই লাজুক বাসিন্দা লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকতে ভালোবাসে, কিন্তু তার ডাকেই সে নিজের উপস্থিতির জানান দেয়।

ডাহুক মূলত জলাভূমি, ধানক্ষেতের পাশের ডোবা, বিল ও ঝোপঝাড়ঘেরা জলাশয়ে বসবাস করে। গায়ের রং বাদামি ও কালচে হওয়ায় শুকনো পাতার স্তূপ বা কচুরিপানার আড়ালে তাকে আলাদা করে চেনা মুশকিল। বিপদ টের পেলে উড়ে না গিয়ে দ্রুত দৌড়ে ঝোপের ভেতর ঢুকে পড়ে—এই স্বভাবের কারণেই অনেকের চোখে সে ধরা দেয় না।

গঠন ও স্বভাব

ডাহুক মাঝারি আকারের পাখি। লম্বা ঠোঁট ও শক্ত পা তার জলাভূমিতে চলাফেরার উপযোগী। পুরুষ ডাহুক সাধারণত বেশি ডাকাডাকি করে, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে। তখন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তার ডাক চারপাশের পরিবেশে এক ধরনের রহস্যময় আবহ তৈরি করে।

এই পাখি মূলত নিশাচর স্বভাবের। দিনের বেলায় ঘন ঝোপে লুকিয়ে থাকে, সন্ধ্যার পর খাবারের সন্ধানে বের হয়। ছোট মাছ, ব্যাঙাচি, কেঁচো, পোকামাকড়—এসবই তার প্রধান খাদ্য।

প্রজনন ও বাসা

বর্ষা মৌসুম এলেই ডাহুকের ব্যস্ততা বাড়ে। জলাভূমির ধারে ঘাস ও নলখাগড়ার আড়ালে সে বাসা বানায়। বাসা খুব সাধারণ—শুকনো ঘাস ও পাতার স্তূপ দিয়েই তার ঘর। সাধারণত ৩ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। মা-বাবা দু’জনেই ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের খাবার জোগায়।

লোককথা ও সংস্কৃতিতে ডাহুক

গ্রামবাংলার লোককথা ও গানে ডাহুকের ডাকের বিশেষ স্থান আছে। অনেক এলাকায় বিশ্বাস করা হয়, ডাহুক ডাকলে বৃষ্টি আসবে। আবার কোথাও বলা হয়, তার ডাক রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও গভীর করে তোলে। কবি ও সাহিত্যিকদের লেখায় ডাহুকের ডাক প্রকৃতির নিঃশব্দ ভাষা হিসেবে উঠে এসেছে বারবার।

বিপন্নতার শঙ্কা

একসময় বাংলাদেশের বিল-ঝিল ও ধানক্ষেতে ডাহুক ছিল পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু জলাভূমি ভরাট, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ও নির্বিচারে শিকার—সব মিলিয়ে তার সংখ্যা কমছে। অনেক জায়গায় এখন ডাহুকের ডাক শোনা যায় খুব কমই।

পাখিবিদরা বলছেন, জলাভূমি সংরক্ষণ না করলে ডাহুকের মতো পাখির অস্তিত্ব আরও ঝুঁকিতে পড়বে। ডাহুক শুধু একটি পাখিই নয়, এটি জলাভূমির স্বাস্থ্য ভালো থাকারও একটি সূচক।

প্রকৃতির নীরব বার্তাবাহক

ডাহুকের ডাক শুনলে মনে হয়, সে যেন মানুষকে সতর্ক করে দিচ্ছে— জলাভূমি বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও। ঝোপের আড়ালে থাকা এই লাজুক পাখিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহরের কোলাহলের বাইরেও একটি নীরব জগৎ আছে, যেখানে প্রতিটি প্রাণীর অস্তিত্বের আলাদা মূল্য রয়েছে।

ডাহুক তাই শুধু একটি পাখির নাম নয়—এটি গ্রামবাংলার রাতের সুর, জলাভূমির গল্প, আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক জীবন্ত স্মারক।