ঢাকা, রবিবার ০৮, মার্চ ২০২৬ ৭:০৬:০১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

নারী দিবস: আলোচনার নয়, বাস্তব কর্মের দিনে পরিণত করতে হবে

জাফর আলম

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:২৭ এএম, ৮ মার্চ ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। শহরের বিদ্যালয়, কলেজ, অফিস ও মিডিয়ার উদ্যোগে নানা আয়োজন হয়—র‌্যালি, সেমিনার, আলোচনা সভা, সভ্যতা-ভিত্তিক কর্মসূচি। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগে নারী অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন—এসব বিষয় নিয়ে প্রচারণা হয়। কিন্তু কি আমরা সত্যিই বুঝতে পারছি, এই দিনটির মূল তাৎপর্য কী? কতজন এই দিনটিকে শুধু প্রতীকী হিসেবে দেখেন না, বরং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজে সমতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার একটি বাস্তব সুযোগ হিসেবে দেখেন?

দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের বাস্তবতা এখনও অনেক দূরে। গৃহকর্মী, খেটে খাওয়া শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষানী, পাহাড়ের নারী—অনেকেই জানেন না এই দিনটি কেন পালন করা হয়। তাদের জীবন প্রতিদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। শহরের আলো-আড়ম্বর, আলোচনা সভা, সামাজিক প্রচারণা—এসব তাদের কাছে পৌঁছায় না।

বাস্তব চিত্র: খেটে খাওয়া নারীর জীবন

ধানমন্ডির একটি বাসায় কাজ করা গৃহকর্মী রহিমা খাতুন বলেন,
“নারী দিবস আবার কী? আমরা তো শুধু ভোর থেকে রাত পর্যন্ত খেতে পারি কীভাবে তা নিয়েই ভাবি। পেট চালানোই বড় কথা। দিবস-টিবস করার সময় কোথায়?”

নিউমার্কেট এলাকার ক্ষুদ্র দোকান চালানো সেলিনা আক্তার বলেন,
“কখনো শুনেছি টিভিতে হয়তো নারী দিবস বলে কিছু আছে। কিন্তু ওই দিন আর অন্য দিনের মধ্যে পার্থক্য দেখি না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকান সামলাই। সংসার চালাতেই হিমশিম।”

বান্দরবানের লংগদুতে একজন মা শিরিনা মং বলেন,
“নারী দিবসের কথা? আমরা তো শুধু সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেতে পারি কীভাবে তা নিয়েই ভাবি। অন্য কোনো দিন-দিনের ব্যাপার আমাদের জীবনে আসে না।”

পাহাড়ের নারী মালতি রানী যোগ করেন,
“আমরা জানি না নারী দিবস কি। তবে চাই সবাই যেন সমান অধিকার পায়। ছেলে-মেয়ের মধ্যে তফাৎ না থাকে।”

নারী দিবসের ইতিহাস এবং তাৎপর্য

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা শ্রমিক নারীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার আন্দোলন থেকে। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা, কম মজুরি ও ভোটাধিকার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় লড়াই।

পরবর্তীতে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী Clara Zetkin ১৯১০ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে নারীর অধিকার, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আন্তর্জাতিক দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। সম্মেলনে উপস্থিত শতাধিক নারী নেত্রী তাঁর প্রস্তাব সমর্থন করেন। ১৯১১ সালে প্রথমবারের মতো বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হয়।

জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকে বাংলাদেশের মতো সদস্য রাষ্ট্রগুলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দিবসটি পালন করে। তবে শহর ও গ্রাম—বিশেষ করে পাহাড়ি, নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে সচেতনতা এখনও সীমিত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে নারী দিবস পালন করা হলেও নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আইন-সুবিধা—এক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। নারী অধিকারকর্মী ও গবেষকরা বলছেন, বাল্যবিয়ে, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরিতে বৈষম্য এবং সামাজিক কুসংস্কার এখনও বড় বাধা।

পাহাড়ি অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও দুঃখজনক। কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান—এই অঞ্চলের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বেসরকারি উদ্যোগ ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছায় না। তারা জানে না আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী এবং কেন পালন করা হয়।

নারীর জন্য সমান সুযোগ ও মর্যাদা: সময়ের দাবি

নারী দিবস কেবল র‌্যালি, সেমিনার বা সামাজিক প্রচারণা নয়। এটি একটি বার্তা—নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের উন্নয়ন নারী-পুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করছে। নারী শুধুই ঘর-সংসারের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশাসন, অর্থনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “নারী দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য পৌঁছাতে হলে খেটে খাওয়া, শ্রমজীবী, পাহাড়ি ও গ্রামীণ নারীর জীবনেও তা বাস্তবায়িত হতে হবে। আলোচনার সময় শেষ, কাজের সময় এসেছে।”

ফাতিমা চাকমা, পাহাড়ের একজন শ্রমিক নারী, বলেন,
“আমরা চাই কেউ আমাদের কথা শোনুক, দেখুক। নারী দিবস মানে শুধু শহরের মানুষদের জন্য নয়—আমাদের জন্যও। আমরা চাই মর্যাদা, সুযোগ ও নিরাপত্তা।”

শিরিনা মং যোগ করেন,
“দিনশেষে আমাদের জন্যও সমান অধিকার হোক। যদি সত্যি নারী দিবস মানে সমতা, তাহলে আমাদের জীবনে তার প্রভাব দেখা উচিত।”

উপসংহার

নারী দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সচেতনতা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এই দিবসকে নিয়ে বাস্তব কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া বিকল্প নেই। আলোচনার সময় শেষ, কাজের সময় এসেছে।

জাফর আলম: উন্নয়ন কর্মী। পরিচালক-বিকশিত বাংলাদেশ।