হাতের কাজ ও পোশাক তৈরিতে ব্যস্ত নারী কারিগর
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:২৭ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬ বুধবার
ছবি: সংগ্রহিত।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে হাতের কাজ করা পোশাক তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন রংপুর বিভাগের হাজারো নারী কারিগর। শাড়ি, থ্রি-পিস ও মেয়েদের নানা পোশাকে সূচিকর্ম, চুমকি ও নকশার কাজ করে তারা যেমন ঈদের বাজারের চাহিদা পূরণ করছেন, তেমনি বাড়তি আয় করে পরিবারে স্বচ্ছলতাও আনছেন।
স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রংপুর বিভাগের প্রায় ৪০ হাজার নারী ঘরে বসেই হাতের কাজ ও সূচিকর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ঈদ সামনে আসায় অভিজাত মার্কেটগুলোতে হাতের কাজ করা পোশাকের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে এসব নারী কারিগর দিন-রাত পরিশ্রম করে অর্ডার অনুযায়ী পোশাক তৈরি করছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) রংপুরের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শামিম হোসেন জানান, নারী কারিগররা শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাকে এমব্রয়ডারি, চুমকি ও নান্দনিক হাতের কাজ করছেন। এই শিল্প গ্রামীণ নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বিসিকের পাশাপাশি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও এই খাতের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে।
রংপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল খালেক বলেন, তাদের সহায়তায় রংপুর অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার নারী সেলাই ও এমব্রয়ডারির প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ঘরে বসেই কাজ শুরু করতে পারেন।
রংপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাওসার পারভিন জানান, গত ১৩ বছরে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন হাজার নারী সেলাই ও সূচিকর্ম শিখে নিয়মিত আয় করছেন।
রংপুরের নারী উদ্যোক্তা সানজিদা লোপা জানান, তিনি একটি বুটিক হাউস পরিচালনা করছেন যেখানে ১২ জন নারী কারিগর কাজ করেন। তারা প্রত্যেকে মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার ঈদকে সামনে রেখে অর্ডার অনেক বেশি। ফলে শাড়ি ও থ্রি-পিসে এমব্রয়ডারি ও চুমকির কাজ করতে বেশ চাপ সামলাতে হচ্ছে।”
বদরগঞ্জ উপজেলার চানকুটি দাঙ্গা গ্রামের উদ্যোক্তা চাঁদ মিয়া বলেন, গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার ফলে এই শিল্পের প্রসার ঘটছে। অনেক অসচ্ছল নারী এখন নিজের আয়েই পরিবার চালাতে পারছেন।
স্থানীয় কারিগর শামিমা, মর্জিনা, সোহানা ও মল্লিকা জানান, সূচিকর্মের কাজ শিখে তারা আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। তাদের গ্রামের অনেক নারী ও কিশোরীও এখন এই কাজে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কারিগর আনোয়ারা কলি, মেহবুবা, শাবানা বেগম, সালেহা খাতুন ও নূরজাহান বলেন, ঈদের আগে এমব্রয়ডারির কাজ করে তারা ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার উদ্যোক্তা ফরিদা পারভিন জানান, তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই এলাকায় ৬০০–এর বেশি নারী সূচিকর্মের কাজ শিখে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের দক্ষতা ও কাজের মান অনুযায়ী কারিগররা মাসে ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
রংপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নর্থবেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এর চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সামসুজ্জামান বলেন, এমব্রয়ডারি ও চুমকির কাজ গ্রামীণ নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। এটি কুটির শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে।
