ঢাকা, শনিবার ১৪, মার্চ ২০২৬ ৩:৩৫:৩৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড বইমেলা, বিপাকে পাঠক-প্রকাশক

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৩১ পিএম, ১৩ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আজ উৎসবমুখর পরিবেশে জমে উঠেছিল অমর একুশে বইমেলা। আজ শুক্রবার ১৬তম দিন। বিকেল থেকেই পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের পদচারণায় মুখর ছিল পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ। কিন্তু সন্ধ্যার পর হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়, ঝুম বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে মুহূর্তেই বদলে যায় পরিস্থিতি। আনন্দমুখর মেলা পরিণত হয় বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতিতে—একদিকে বই বাঁচানোর চেষ্টা, অন্যদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করতে দেখা যায় পাঠক ও প্রকাশকদের।

সন্ধ্যার দিকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখা দেওয়ায় মেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বারবার মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। প্রকাশকদের স্টলে বই নিরাপদে রাখার পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সতর্কতার মধ্যেই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নেমে আসে প্রবল বৃষ্টি, সঙ্গে বড় বড় শিলাও পড়তে থাকে।

অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়া পাঠক ও দর্শনার্থীরা তখন দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। অনেকেই আশ্রয় নেন বিভিন্ন স্টলের নিচে। কেউ কেউ আবার কাছাকাছি ভবন কিংবা গাছতলায় দাঁড়িয়ে ঝড় থামার অপেক্ষা করেন। ইফতারের পর আড্ডায় ব্যস্ত থাকা লেখক-পাঠকদের অনেকেই বৃষ্টির মধ্যে আটকা পড়েন।

প্রবল বৃষ্টির কারণে বেশ কয়েকটি স্টলে পানি ঢুকে বই ভিজে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রকাশকরা দ্রুত ত্রিপাল টানিয়ে বা প্লাস্টিক দিয়ে বই ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন। তবে অনেক জায়গায় পানি ঢোকা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

এক প্রকাশক জানান, “স্টল ত্রিপাল দিয়ে ঢেকে রাখা হলেও ঝড়ের দমকা হাওয়ায় অনেক জায়গা দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বই বাঁচাতেই তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।”

আরেক স্টল ব্যবস্থাপক বলেন, “হঠাৎ এত বৃষ্টি হবে বুঝতে পারিনি। চেষ্টা করেও কিছু বই ভিজে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়নি।”

ঝড়ের মধ্যে রাত আটটার পর মেলার কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় অনেককে মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে চলাফেরা করতে দেখা যায়। স্টলকর্মীদের কেউ কেউ ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়ে বই সরিয়ে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, মেলার কিছু নিচু অংশে পানি জমে গেছে। কোথাও কোথাও স্টলের ছাউনি থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিছু অংশে পানি জমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

অনেক দর্শনার্থীকে বৃষ্টিতে ভিজে দ্রুত মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়তে দেখা গেছে। কেউ কেউ ভিজে কাপড়েই বাসার পথে রওনা হন। লেখক ও পাঠকদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, আকস্মিক বৃষ্টিতে পুরো মেলার পরিবেশ একেবারে বদলে যায়।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজক ও প্রকাশকরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার চেষ্টা শুরু করেন। তবে ঝড়-বৃষ্টির কারণে ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে অমর একুশে বইমেলার ১৬তম দিনে আজ শুক্রবার নতুন বই এসেছে ২৭৭টি।

সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলেছে।

মেলায় ছিল শিশুপ্রহর :

আজ মেলার শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ।

এতে আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, বদরুদ্দীন উমরের প্রধান পরিচয় তিনি একজন রাজনীতিবিদ, একজন বিপ্লবী তাত্ত্বিক। রাজনৈতিক বিপ্লব ছিল যার জীবনের উদ্দিষ্ট।

অন্যদিকে, তিনি একজন সমাজ বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী। উনিশ শতক নিয়ে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল, কারণ তিনি উনিশ শতকেই গড়ে ওঠা এখানকার মধ্যবিত্তের সংকটকে সূত্রপাতের সময়টি দিয়েও বুঝতে চেয়েছেন। দেশভাগ নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল, কারণ আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তা পরবর্তীকালের রাজনৈতিক গতিপথকে বহুভাবে প্রভাবিত করেছে। কৃষক ও কৃষি নিয়ে বদরুদ্দীন উমর বিপুল পরিমাণে লিখেছেন, কারণ এই দেশে সমাজ-রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে তিনি ভূমি সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।

তিনি আরো বলেন, এই সবগুলো বিষয়েই বদরুদ্দীন উমরের লেখালেখি বেশ জনপ্রিয় এবং এখনও পাঠকপ্রিয়। তাঁর রাজনীতির সঙ্গেও এই রচনাগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সুমন রহমান বলেন, বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশে মার্কসবাদের রূপ এবং যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক সমস্যাটি তিনি সুচারুরূপে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের ধারণাকে যেমন সমর্থন জানিয়েছেন, তেমনি অভ্যুত্থানকে বিপ্লবের পৌঁছানোর একটি পথ বলে মনে করেছেন। চিন্তার ব্যাপ্তি ও তাত্ত্বিক ধারণাসমূহের জন্য তিনি নিঃসন্দেহে দীর্ঘকাল প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

মোহাম্মদ আজম বলেন, বদরুদ্দীন উমরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, তিনি একজন একাডেমিক বুদ্ধিজীবী। তিনি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব চাইতেন, গণ-অভ্যুত্থান চাইতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষাটি ছিল একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিগঠিত হওয়া, আর এজন্য তিনি অনবরত সমসাময়িক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গেছেন এবং জনগণের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন নাসির আলী মামুন এবং মোহন রায়হান।

বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আগামীকাল ১৪ই মার্চ শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।