জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সব দায় নারীর কাঁধে, নীতিতে ফাঁকফোকর
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১১ পিএম, ২৮ মার্চ ২০২৬ শনিবার
প্রতীকী ছবি।
দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় বারবার সামনে আসে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টি। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এই দায়িত্বের প্রায় পুরোটা এখনও নারীদের কাঁধেই বর্তায়। সচেতনতা, পদ্ধতি গ্রহণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—সবকিছুর ভার নারীকেই বহন করতে হচ্ছে, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, পরিবার পরিকল্পনায় ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে বড় অংশই নারী নির্ভর—যেমন পিল, ইনজেকশন, আইইউডি কিংবা স্থায়ী পদ্ধতি। অন্যদিকে পুরুষদের জন্য প্রধানত কনডম ও ভ্যাসেকটমি থাকলেও, এসব পদ্ধতি গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
রাজধানীর একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমা সুলতানা বলেন, “আমাদের কাছে যে রোগীরা আসেন, তাদের বেশিরভাগই নারীরা। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে পুরুষরা খুব কমই আগ্রহ দেখান। অথচ এটি যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত।”
মাঠ পর্যায়ে কাজ করা পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। গাজীপুরের এক পরিবার কল্যাণ সহকারী বলেন, “আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদেরই বেশি পাই। পুরুষরা সাধারণত বাইরে থাকেন বা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না। ফলে নারীদেরকেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আবার অনেক সময় স্বামীর অনুমতির ওপরও নির্ভর করতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিবার পরিকল্পনাকে নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে পুরুষরা বিষয়টি এড়িয়ে যান, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণে অনীহা দেখান।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে একপাক্ষিকভাবে দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে টেকসই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এতে নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়েন। দীর্ঘদিন পিল বা ইনজেকশন ব্যবহারের ফলে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “আমাদের নীতিমালায় এখনও পুরুষদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ক্যাম্পেইনগুলোতেও নারীকেই টার্গেট করা হয় বেশি। ফলে ধারণাটা তৈরি হয়েছে—এটা নারীর কাজ।”
এদিকে, মাঠপর্যায়ে কর্মরত এনজিওকর্মীরা জানান, অনেক নারী বাধ্য হয়ে পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি গ্রহণ করেন। কারণ, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের দায়ও শেষ পর্যন্ত তাদেরই নিতে হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক চাপও তৈরি হয়।
মিরপুরের এক গৃহিণী বলেন, “স্বামী এসব নিয়ে কথা বলতে চান না। আমাকেই সব দেখতে হয়। কিন্তু অনেক সময় শরীর খারাপ লাগে, তারপরও চালিয়ে যেতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনে পুরুষদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে পুরুষদের পরিবার পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পুরুষরা সহজেই পরামর্শ নিতে পারেন।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে শুধুমাত্র নারীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবেই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে।
