ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৬:৫২:৫৪ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

লাল কুঠি: নতুন রূপে পুরোনো ঢাকার ইতিহাসের গল্প

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:২৮ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

বুড়িগঙ্গার তীর ছুঁয়ে আসা হালকা বাতাস, বিকেলের ম্লান আলো আর পুরান ঢাকার চিরচেনা কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় সময়। চোখে পড়ে লাল ইটের এক অনিন্দ্য স্থাপনা—নর্থব্রুক হল (লাল কুঠি)। পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে অবস্থিত এই লাল কুঠি।

নতুন করে সংস্কার করা এই ভবনটি যেন আজ আবার কথা বলতে শুরু করেছে—ইতিহাস, সংস্কৃতি আর স্মৃতির এক অনন্য ভাষায়।ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভবনটিতে ঢাকার জমিদার, বণিক আর সংস্কৃতিপ্রেমীরা আয়োজন করতেন নাটক, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের। কলকাতার প্রভাব ঢাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই লালকুঠিকে ঘিরে। শুধু বিনোদনই নয়, এ ছিল সামাজিক-রাজনৈতিক আলোচনারও কেন্দ্র। 

ঔপনিবেশিক ঢাকার এক সাংস্কৃতিক অঙ্গন

১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা উদ্যোগ নেন তাঁর নামে একটি টাউন হল নির্মাণের। ১৮৭৯ সালের শেষের দিকে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৮৮০ সালের ২৫ মে ঢাকার কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন এই ভবন। ভবনের লাল রঙ থেকেই পরবর্তীতে এর নাম হয় লালকুঠি।

প্রথম দিকে এখানে পদস্থ কর্মকর্তা ও অভিজাত সমাজের সভা, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ১৮৮২ সালে এটি পাঠাগারে রূপান্তরিত হয় এবং যুক্ত করা হয় জনসন হল নামে একটি ক্লাবঘর। কয়েক বছরের মধ্যেই এর বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৮৮৭ সালে বিলেত থেকে বই আনার ঘটনাও রয়েছে এর ইতিহাসে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত এই ভবনটি মূলত “নর্থব্রুক হল” নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুকের নামানুসারে এর নামকরণ।

লাল ইটের ব্যবহার, খিলানযুক্ত দরজা, উঁচু বারান্দা আর খোলা প্রাঙ্গণ—সব মিলিয়ে এটি ছিল ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যের এক মিশ্র নিদর্শন।

কিন্তু স্থাপত্যের বাইরেও এর পরিচয় ছিল আরও বড়—এটি ছিল তৎকালীন ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।

যে প্রাঙ্গণে ধ্বনিত হয়েছিল বিশ্বকবির সম্মাননা

এই লাল কুঠির ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি জড়িয়ে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সঙ্গে।

১৯২৬ সালে তাঁর ঢাকায় আগমন ছিল এক বিরাট সাংস্কৃতিক ঘটনা। সেই সময় তিনি শুধু একজন কবি নন—তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক প্রতীক, বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এক সাহিত্যিক।

ঢাকার শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও নাগরিক সমাজ তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে এগিয়ে আসে। আর সেই সম্মাননার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় এই লাল কুঠিতেই। ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে ঢাকা পৌরসভা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়।

কল্পনা করা যায়—প্রাঙ্গণ ভরে আছে মানুষের ভিড়ে, আলো ঝলমলে পরিবেশ, করতালির ধ্বনি, আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ।

সেদিন লাল কুঠি শুধু একটি ভবন ছিল না—এটি হয়ে উঠেছিল বাঙালি সংস্কৃতির এক গর্বিত মঞ্চ।

পুরান ঢাকার প্রেক্ষাপটে এক জীবন্ত ইতিহাস

পুরান ঢাকা নিজেই যেন একটি জীবন্ত ইতিহাসের বই।

এই অঞ্চলের প্রতিটি স্থাপনা—তার অলিগলি, তার বারান্দা, তার পুরোনো দেয়াল—সবকিছুতেই জমে আছে সময়ের গল্প।

লাল কুঠি সেই গল্পেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে ঔপনিবেশিক শাসন, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং নাগরিক জীবনের পরিবর্তন একসঙ্গে ধরা পড়ে।

অবহেলা থেকে পুনর্জন্ম

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিও অবহেলার শিকার হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নগরায়ণের চাপ এবং উদাসীনতার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল এর সৌন্দর্য।

কিন্তু সাম্প্রতিক সংস্কার কার্যক্রম সেই হারিয়ে যাওয়া জৌলুস ফিরিয়ে এনেছে।

দেয়ালের লাল আভা, খিলান, স্থাপত্যের সূক্ষ্ম নকশা—সবকিছুই যত্ন নিয়ে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এখন এটি আবার দাঁড়িয়ে আছে—গর্বিত, দৃঢ় এবং জীবন্ত।

ঐতিহ্য রক্ষার এক প্রতীক

লাল কুঠির এই পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা সম্ভব, যদি থাকে সদিচ্ছা ও পরিকল্পনা।

পুরান ঢাকার আরও অনেক স্থাপনা আজও অবহেলায় পড়ে আছে। লাল কুঠির মতো উদ্যোগ যদি সেগুলোর ক্ষেত্রেও নেওয়া যায়, তবে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বড় অংশই পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।

নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন দরজা

সংস্কারের পর লাল কুঠি এখন শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি একটি অভিজ্ঞতা।

এখানে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ কল্পনা করতে পারে—
কেমন ছিল সেই সময়,
কেমন ছিল সেই মানুষগুলো,
আর কেমন করে এই শহর তার সংস্কৃতির পরিচয় গড়ে তুলেছিল।

শেষ দৃশ্য: লাল দেয়ালে লেখা ইতিহাস

সন্ধ্যার আলো যখন ধীরে ধীরে নেমে আসে, লাল কুঠির লাল দেয়ালে তখন পড়ে নরম ছায়া।

এই দেয়ালগুলো শুধু ইটের নয়—এগুলো সাক্ষী এক শহরের ইতিহাসের, এক কবির সম্মাননার, আর এক জাতির সাংস্কৃতিক গৌরবের।

লাল কুঠি তাই শুধু অতীত নয়— এটি বর্তমানের গর্ব, আর ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা।