একদুয়ারিয়া এখন বিদেশি পর্যটনের কেন্দ্র, বিদেশীরা আসছে
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:৪৮ এএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬ শনিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে, ধুলোমাখা পথ আর সবুজে মোড়া এক ভিন্ন জগতে এসে থমকে যান তারা। এ এক নতুন জগৎ। ধানক্ষেতের দোলা, কাদামাটির সরু পথ, পুকুরের জলে ঝিলিক—সব মিলিয়ে নরসিংদীর মনোহরদীর একদুয়ারিয়া গ্রাম এখন বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতার ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের শতাধিক পর্যটক ছুটে এসেছেন এই গ্রামে। আধুনিক নগরজীবনের যান্ত্রিকতা থেকে দূরে এসে তারা খুঁজে নিচ্ছেন সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনের স্বাদ—যেখানে প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ভিন্ন।
এখানে এসে তারা কেবল দর্শক নন, হয়ে ওঠেন গ্রামেরই একজন। ধানখেত ঘুরে দেখা, গরুর দুধ দোহন শেখা, পুকুরে মাছ ধরা, এমনকি কাদামাটিতে গড়াগড়ি—সবকিছুই তাদের কাছে রোমাঞ্চকর। বিকেলে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন, চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেন, কখনো বা টেলিভিশনের সামনে সময় কাটান। ভাষার সীমাবদ্ধতা থাকলেও হাসি আর ইশারাই হয়ে ওঠে যোগাযোগের সেতু।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন জাফর তুহিন। ২০২২ সাল থেকে তিনি গ্রামভিত্তিক ভ্রমণ প্যাকেজ চালু করেন। তার প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে একদুয়ারিয়া গ্রাম আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নজরে আসে। নিজের বাড়িতেই তিনি অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন, আর নিজেই হয়ে ওঠেন তাদের গাইড ও সঙ্গী।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে আসা দম্পতি টাজ ও লিব্বি কয়েকদিন কাটিয়ে গেছেন এই গ্রামে। তাদের ভিডিও ব্লগে উঠে এসেছে গ্রামবাংলার জীবন্ত চিত্র। লিব্বি বলেন, এখানকার মানুষের আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে। অল্প সময়েই তিনি ডিম ও রুটি বানানো শিখে ফেলেছেন। আর টাজ মজা করে জানান, তিনি এখন দিব্যি লুঙ্গি পরে গ্রাম ঘুরে বেড়ান।
তিন দিন চার রাতের একটি প্যাকেজের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৪০০ ডলার। অতিরিক্ত সময় থাকলে বাড়ে খরচও। তবে পর্যটকদের কাছে এই অভিজ্ঞতা টাকার হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
জাফর তুহিনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথচলার গল্প। নরসিংদী থেকে ঢাকায় পড়াশোনা, টিউশনি করে জীবন চালানো, দেশজুড়ে ভ্রমণ—সবকিছু মিলিয়ে তার ভেতরে তৈরি হয় এক ভ্রমণপিপাসু মন। পরে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশিদের আতিথ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে অনুপ্রাণিত করে। করোনা মহামারির সময় গ্রামে ফিরে সেই অভিজ্ঞতাকেই বাস্তবে রূপ দেন তিনি।
বর্তমানে তার ‘তাঁবু ট্যুর’ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা তার মাধ্যমে গ্রামে আসছেন।
বিদেশিদের আগমনে বদলে যাচ্ছে গ্রামের আবহও। স্থানীয়রা বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচকভাবে। তাদের কাছে এটি শুধু পর্যটন নয়, বরং নতুন এক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জানালা।
সব মিলিয়ে, একদুয়ারিয়া এখন শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি হয়ে উঠেছে দুই ভিন্ন জগতের মিলনস্থল, যেখানে সরল জীবন আর অচেনা বিস্ময় হাত ধরাধরি করে হাঁটে।
