ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ১০:১৫:১৫ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

লেজে রাজকীয় সৌন্দর্য, বনে-গ্রামে দুধরাজের গল্প

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:৪৩ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ শুক্রবার

লেজে রাজকীয় সৌন্দর্য, বনে-গ্রামে দুধরাজের গল্প

লেজে রাজকীয় সৌন্দর্য, বনে-গ্রামে দুধরাজের গল্প

বাংলার গাছপালা ঘেরা প্রান্তর, গ্রাম কিংবা শহরতলির নিস্তব্ধ সবুজে হঠাৎই চোখে পড়ে এক অপূর্ব পাখি—দুধরাজ। লম্বা সাদা ফিতা-সদৃশ লেজ, চকচকে কালো মাথা আর মসৃণ ভঙ্গিতে উড়ে বেড়ানো এই পাখি যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।

দুধরাজ পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Terpsiphone paradisi। ইংরেজিতে একে বলা হয় “Asian Paradise Flycatcher”—নামের মধ্যেই যার সৌন্দর্যের পরিচয় লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল, এমনকি শহরের বড় গাছপালায়ও এদের দেখা মেলে, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে।

রঙ বদলের বিস্ময়
দুধরাজের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এর রঙের পরিবর্তন। তরুণ পুরুষ পাখি সাধারণত লালচে-বাদামি রঙের হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যায়, আর লেজ হয়ে ওঠে দীর্ঘ ও দৃষ্টিনন্দন। অন্যদিকে, স্ত্রী পাখি সাধারণত বাদামি-লালচে রঙেরই থাকে এবং তার লেজ তুলনামূলক ছোট।

লেজ যেন উড়ন্ত ফিতা
পুরুষ দুধরাজের লেজ কখনও কখনও শরীরের চেয়েও দুই-তিন গুণ লম্বা হয়। উড়ার সময় এই লেজ বাতাসে দুলতে থাকে, যা তাকে অন্য সব পাখির থেকে আলাদা করে তোলে। এই লেজই তার আকর্ষণের মূল কেন্দ্র, বিশেষ করে সঙ্গী আকর্ষণে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যাভ্যাস ও শিকার কৌশল
দুধরাজ মূলত কীটভুক পাখি। উড়ন্ত অবস্থায়ই পোকামাকড় ধরে খাওয়ার অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে এদের। ডাল থেকে হঠাৎ উড়ে গিয়ে বাতাসে শিকার ধরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসা—এই কৌশলই তাদের বিশেষত্ব।

বাসা ও প্রজনন
গাছের ডালের কাঁটা বা ফাঁকে ছোট ও নিখুঁতভাবে দুধরাজ তার বাসা তৈরি করে। ডালপালা, তন্তু, মাকড়সার জাল—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি মজবুত ছোট কাপের মতো বাসা। সাধারণত স্ত্রী পাখি ডিম পাড়ে এবং উভয় পাখিই ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালন-পালন করে।

লোকজ সংস্কৃতিতে দুধরাজ
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতেও দুধরাজের উপস্থিতি আছে। এর সৌন্দর্য, সাদা রঙ আর রাজকীয় ভঙ্গিমা মানুষের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে বহুদিন আগে থেকেই। “দুধরাজ” নামটিও এসেছে এর সাদা, দুধের মতো রঙ এবং রাজসিক উপস্থিতি থেকে।

সংরক্ষণের প্রয়োজন
যদিও দুধরাজ এখনো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে নেই, তবে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং কীটনাশকের ব্যবহার এদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে গাছপালা সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, দুধরাজ শুধু একটি পাখি নয়—এ যেন প্রকৃতির এক চলমান কবিতা। যার প্রতিটি উড়ান, প্রতিটি ভঙ্গিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য ঠিক কতটা নিখুঁত হতে পারে।

আইরীন নিয়াজী মান্না: পাখি পর্যবেক্ষক। আহবায়ক: বাংলাদেশ বার্ড ওয়াচার সোসাইটি।