বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম দরকার?
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:৩১ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২৬ সোমবার
ছবি: সংগ্রহিত।
দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যম বাস্তবতায় দিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার সাংবাদিকতা চর্চা, সংগঠন কাঠামো ও পেশাগত সংস্কৃতি প্রায়ই প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। সেই দিক থেকে নারী সাংবাদিকদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরির ক্ষেত্রে দিল্লির অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
নিউ দিল্লিতে Indian Women’s Press Corps (IWPC) দীর্ঘদিন ধরে নারী সাংবাদিকদের একটি শক্তিশালী পেশাগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। এটি ঐতিহ্যগত অর্থে কোনো “প্রেসক্লাব” না হলেও বাস্তবে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন—যেখানে নারী সাংবাদিকরা একত্রিত হন, মতবিনিময় করেন, প্রশিক্ষণ ও আলোচনায় অংশ নেন এবং প্রয়োজনে পেশাগত ও নৈতিক ইস্যুতে অবস্থান নেন। একই শহরে Press Club of India-এর মতো মূলধারার প্রতিষ্ঠানও সক্রিয়, যেখানে নারী-পুরুষ উভয় সাংবাদিকের অংশগ্রহণ রয়েছে।
এই দ্বৈত কাঠামো—একদিকে মূলধারার উন্মুক্ত প্রেসক্লাব, অন্যদিকে নারী সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সংগঠন—দিল্লির মডেলকে আলাদা গুরুত্ব দেয়। কারণ এটি কোনো বিভাজন তৈরি না করে বরং একটি পরিপূরক সম্পর্ক গড়ে তোলে। নারী সাংবাদিকরা মূলধারায় কাজ করছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন; আবার একইসঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজন নিয়ে আলাদা একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিসরও পাচ্ছেন।
দিল্লির এই অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমত, মূলধারার প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করলেই সব সমস্যা সমাধান হয় না। কাঠামোগত বৈষম্য, অঘোষিত বাধা, কিংবা কর্মক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বৈষম্যের বিষয়গুলো প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে একটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম নারী সাংবাদিকদের জন্য সেই অদৃশ্য সমস্যাগুলো দৃশ্যমান করার জায়গা তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, নেটওয়ার্কিং ও মেন্টরশিপের গুরুত্ব এখানে বড় হয়ে ওঠে। একজন নতুন নারী সাংবাদিক যখন পেশায় প্রবেশ করেন, তখন অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। IWPC-এর মতো সংগঠন সেই সেতুবন্ধন তৈরি করে—যা অনেক সময় বড় প্রেসক্লাবগুলোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে না।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ও সহায়তার বিষয়টি। মাঠপর্যায়ে কাজ করা নারী সাংবাদিকদের জন্য হয়রানি, অনলাইন আক্রমণ বা পেশাগত চাপ—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম থাকলে এসব পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, আইনি সহায়তা কিংবা নৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হয়।
এখন প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি এই মডেল থেকে কিছু শিখতে পারে?
বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ বাড়লেও চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিদ্যমান। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, রাতের শিফট, নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগের প্রশ্নে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। পাশাপাশি নেতৃত্বের স্তরে নারীর উপস্থিতি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এই বাস্তবতায় দিল্লির মডেল একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে পারে। অর্থাৎ, আলাদা “নারী প্রেসক্লাব” গঠন করা না-করার বিতর্কে আটকে না থেকে বরং একটি শক্তিশালী নারী সাংবাদিক নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে—যা মূল প্রেসক্লাবগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম যেন কখনোই বিচ্ছিন্নতার প্রতীক না হয়ে ওঠে। বরং এটি এমন একটি কাঠামো হওয়া উচিত, যা মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে উৎসাহিত করবে। অর্থাৎ লক্ষ্য হবে সমতা প্রতিষ্ঠা—বিভাজন নয়।
সবশেষে বলা যায়, দিল্লির অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—নারী সাংবাদিকদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম কোনো প্রতিযোগী কাঠামো নয়, বরং একটি সহায়ক শক্তি। বাংলাদেশেও যদি এই ধারণাকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ করা যায়, তবে তা শুধু নারী সাংবাদিকদের জন্যই নয়, পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্যই ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।
আইরীন নিয়াজী মান্না, সিনিয়র সাংবাদিক, সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম
