ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ১০:১৩:২২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দাবদাহে মায়ের অপেক্ষা: এক লিটার তেলে ছেলের জীবিকা ফেরানোর লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:১৮ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

প্রখর রোদে ঝলসে উঠছে চারদিক। সেই আগুনঝরা দুপুরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন এক মা—বিথিকা রানী বৈদ্য। হাতে নেই কোনো বিলাস, নেই ব্যক্তিগত স্বার্থ; আছে শুধু সন্তানের সংসার বাঁচানোর তাগিদ। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ডেমলা ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মোটরসাইকেলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তিনি যেন এক প্রতীক—সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি।

তার ছেলে সাগর বৈদ্য, পেশায় মোটরসাইকেল ভাড়াচালক। সেই আয়ে চলে সংসার। কিন্তু জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে থমকে গেছে তার জীবনের চাকা। তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে সে এখন মাঠে শ্রমিকের কাজ করছে। আর সেই শূন্যতা পূরণে, সংসারের হাল ধরতে, মা নিজেই নেমে পড়েছেন তেলের লাইনে—একটু পেট্রোলের আশায়, একটু স্বস্তির খোঁজে।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল থেকে দগ্ধ গরমে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। একদিন নয়, টানা দুই দিন ধরে অপেক্ষা। তবুও অনিশ্চয়তা কাটে না—আজ আদৌ তেল পাবেন তো?

পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে তেল সরবরাহ শুরু হলেও, পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ইউনিয়নভিত্তিক তেল বিতরণের ঘোষণার পরও বিশৃঙ্খলা যেন পিছু ছাড়ছে না। বুড়িগোয়লিনি ইউনিয়নে তেল দেওয়ার সময় ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা—স্টেশন ম্যানেজারকে মারধরের অভিযোগ ওঠে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার রেশ টেনে পাঁচ দিন বন্ধ থাকে তেল সরবরাহ।

এখন আবার চালু হলেও অভিযোগের শেষ নেই। সকালবেলায় নির্দিষ্ট সময় সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের তেল দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের জন্য যা থাকে, তা যেন অপ্রতুল। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ দেখছেন—নিয়মের বাইরে কিছু মানুষ সহজেই তেল পাচ্ছেন। ক্ষোভ আর হতাশা জমে উঠছে ধীরে ধীরে।

মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নে রয়েছে দুই হাজারেরও বেশি মোটরসাইকেল। এদের বড় একটি অংশ জীবিকার জন্য এই বাহনের ওপর নির্ভরশীল। তেল না পেয়ে অনেকেই এখন বেকার, কেউবা পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পরিবারের চিত্রও—পুরুষের জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই এখন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন।

বিথিকা রানী বৈদ্যের কণ্ঠে সেই বাস্তবতার করুণ প্রতিধ্বনি—
“আমার ছেলে সাগর মোটরসাইকেল চালিয়ে আর কৃষিকাজ করে সংসার চালায়। তেল না পেয়ে সে মাঠে কাজ করতে গেছে। তাই আমি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। গতকাল থেকেই অপেক্ষা করছি—আজ তেল পাবো কিনা জানি না।”

এই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষই যেন একেকটি গল্প—সংগ্রামের, বেঁচে থাকার, আর অবহেলার। আর বিথিকার মতো মায়েরা সেই গল্পের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী চরিত্র।

স্থানীয় ইউপি সদস্য দেবাশীষ গায়েন জানিয়েছেন, বিশৃঙ্খলার কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকলেও এখন আবার শুরু হয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের সমন্বয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংকট কবে কাটবে? আর কতদিন এমন দগ্ধ দুপুরে মায়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সন্তানের জীবিকার জন্য?

এই দৃশ্য শুধু একটি ফিলিং স্টেশনের নয়; এটি এক বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি—যেখানে জ্বালানির অভাব শুধু গাড়ি থামায় না, থামিয়ে দেয় মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতিও।