বাকস্বাধীনতার আড়ালে নারীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সহিংসতা
মানিক নূর
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:৩৪ পিএম, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ রবিবার
প্রতীকী ছবি।
ডিজিটাল যুগে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তার অপব্যবহারও। বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন নির্যাতন এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত দেওয়া, ছবি প্রকাশ করা কিংবা জনসমক্ষে সক্রিয় থাকলেই অনেক নারীকে হতে হচ্ছে কটূক্তি, হুমকি, চরিত্রহনন এমনকি সংগঠিত ট্রলের শিকার। প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি সত্যিই বাকস্বাধীনতার অংশ, নাকি স্পষ্ট ডিজিটাল সহিংসতা?
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনা এ প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
সম্প্রতি জাইমা রহমানের ছবি বিকৃত করা এবং নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাসনিম জারাকে অনলাইনে লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি উদ্বেগজনক ধারার অংশ, যেখানে জনপরিসরে প্রবেশ করা নারীদের নিয়মিতভাবে ডিজিটাল অপমানের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়, যা প্রায়ই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ। যেসব নারী জনপরিসরে পা রাখেন, তাদের প্রায়শই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ডিজিটাল অবমাননার মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়।
নারী সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী—কেউই এই নির্যাতন থেকে মুক্ত নন। ফেসবুক লাইভে কথা বলার অপরাধে, কোনো সামাজিক ইস্যুতে মত দেওয়ার কারণে কিংবা ব্যক্তিগত ছবি ভাইরাল করে—নারীদের টার্গেট করে সংগঠিতভাবে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে এই আক্রমণ আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, যা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাকস্বাধীনতা অবশ্যই একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু এই স্বাধীনতা কখনোই অন্যের সম্মানহানি, মানসিক নির্যাতন বা সহিংস আচরণকে বৈধতা দেয় না। যখন মত প্রকাশের নামে কাউকে অপমান করা হয়, হুমকি দেওয়া হয় কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়—তখন তা আর স্বাধীনতা নয়, বরং নিছক সহিংসতা। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সহিংসতা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের নতুন রূপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—এর প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ছে। অনেক নারী অনলাইন হয়রানির কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন, এমনকি পেশাগত জীবনেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ নিরাপত্তাহীনতার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দিতেও বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ডিজিটাল স্পেস, যা হওয়া উচিত ছিল সবার জন্য সমান সুযোগের জায়গা, তা নারীদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
এখানে রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। আইনগত কাঠামো আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অনলাইন হয়রানির দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনটেন্ট মনিটরিং ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরে ডিজিটাল আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। নারীর কণ্ঠকে দমন করা বা হেয় করা নয়, বরং সম্মান করা শিখতে হবে। বাকস্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সবার জন্য সমান নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
অতএব, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। এটি একটি সামাজিক ও মানবাধিকার ইস্যু, যা মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে ডিজিটাল অগ্রগতির এই যুগেও আমরা মানবিকতায় পিছিয়েই থাকব।
