ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৭:০৬:২০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ছড়ার ভুবনে খালেদ হোসাইন: শব্দের সুরে শিশুমনের আলোকযাত্রা

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:০৩ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ছড়াকার খালেদ হোসাইন। ফাইল ছবি।

ছড়াকার খালেদ হোসাইন। ফাইল ছবি।

বাংলা সাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে ছড়া এমন এক শাখা, যেখানে শব্দ কেবল অর্থ বহন করে না, বরং সুর তোলে, ছবি আঁকে, কল্পনার দুয়ার খুলে দেয়। শিশুমনের প্রথম সাহিত্যিক স্পর্শ অনেক সময়ই ঘটে ছড়ার হাত ধরে। সেই ছড়ার জগতে যাঁরা নির্মাণ করেন আনন্দ, শিক্ষা, মানবিকতা ও স্বপ্নের এক রঙিন ভূবন, তাঁদের মধ্যে ছড়াকার খালেদ হোসাইন একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁর ছড়া শুধু শিশুদের বিনোদন দেয় না; বরং শিশুমনে বপন করে সৌন্দর্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম এবং জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

খালেদ হোসাইনের ছড়ার প্রধান শক্তি হলো তাঁর সহজাত ভাষাবোধ। তিনি জানেন, শিশুদের জন্য লেখা মানে ভাষাকে দুর্বোধ্য করে তোলা নয়; বরং সহজ শব্দের ভেতর গভীর ভাবনা বুনে দেওয়া। তাঁর ছড়ায় ব্যবহৃত শব্দগুলো একদিকে যেমন সহজবোধ্য, অন্যদিকে তেমনি সুরময়। ফলে পাঠক যখন তাঁর ছড়া পড়ে, তখন মনে হয় যেন শব্দগুলো কাগজের গণ্ডি পেরিয়ে গেয়ে উঠছে। এই সুরেলা গঠন তাঁর ছড়াকে আবৃত্তিযোগ্য করে তোলে, যা শিশুদের মনে দীর্ঘদিন অনুরণিত হয়।
খালেদ হোসাইনের ছড়ায় প্রকৃতি এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। নদী, পাখি, ফুল, ঋতুর রূপবৈচিত্র্য, গ্রামের সকাল কিংবা শহুরে বিকেলের আলোছায়া—সবকিছুই তাঁর কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি প্রকৃতিকে কেবল বর্ণনা করেন না, বরং প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে দেন। তাঁর ছড়ায় শিশুরা দেখে আকাশের নীল, শোনে পাতার মর্মর, অনুভব করে শিশিরভেজা ভোর। এই প্রকৃতি-অনুষঙ্গ শিশুমনে পরিবেশ সচেতনতা ও সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করে।

তাঁর রচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষামূলক উপাদানের সাবলীল উপস্থিতি। অনেক লেখক শিশুদের শিক্ষা দিতে গিয়ে ছড়াকে নীতিকথার ভারে ভারাক্রান্ত করে তোলেন। কিন্তু খালেদ হোসাইন এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। তিনি শিক্ষা দেন, তবে তা গল্পের মতো, খেলার ছলে, হাসির ফাঁকে। তাঁর ছড়ায় সততা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, মমত্ববোধ কিংবা দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ এমনভাবে উঠে আসে, যা শিশুর মনে কোনো চাপ সৃষ্টি করে না; বরং আনন্দের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

খালেদ হোসাইনের ছড়ার ভাষাশৈলীতে রয়েছে চমৎকার চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষমতা। তিনি অল্প শব্দে বড় দৃশ্য নির্মাণ করতে পারেন। একটি পঙ্‌ক্তিতে তিনি কখনও এঁকে দেন বর্ষার জানালায় টুপটাপ বৃষ্টির ছবি, কখনও বা শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। এই চিত্রধর্মিতা তাঁর ছড়াকে শুধু পাঠ্য করে তোলে না, বরং দর্শনীয়ও করে তোলে। পাঠকের চোখের সামনে যেন দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে।

তাঁর ছড়ায় হাস্যরসেরও অনন্য উপস্থিতি রয়েছে। শিশুসাহিত্যের একটি বড় শক্তি হলো নির্মল হাসি, আর খালেদ হোসাইন সে জায়গাটি দারুণ দক্ষতায় ধারণ করেছেন। তাঁর অনেক ছড়ায় রয়েছে মজার পরিস্থিতি, শব্দের খেলাচ্ছলে তৈরি হাস্যরস, কখনও হালকা ব্যঙ্গও। তবে এই ব্যঙ্গ কখনও বিদ্রূপে পর্যবসিত হয় না; বরং তা পাঠককে আনন্দ দেয়, ভাবায় এবং সূক্ষ্মভাবে জীবনবোধের শিক্ষা দেয়।

বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও জাতীয় চেতনাও তাঁর ছড়ায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি জানেন, শিশুকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হলে সাহিত্যে দেশীয় উপাদানের উপস্থিতি জরুরি। তাই তাঁর ছড়ায় উঠে আসে গ্রামবাংলার মেঠোপথ, হাটের কোলাহল, উৎসবের আনন্দ, বাংলার ঋতুচক্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই উপাদানগুলো শিশুকে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে।

খালেদ হোসাইনের ছড়া পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি শিশুদের কেবল পাঠক হিসেবে দেখেন না; তিনি তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে ভাবেন। তাই তাঁর রচনায় শিশুর স্বপ্ন, সম্ভাবনা, কৌতূহল ও সৃজনশীলতাকে উসকে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তিনি শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখান, ভাবতে শেখান, পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখান। এই দিক থেকে তাঁর ছড়া নিছক বিনোদন নয়; বরং শিশুমন গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উপকরণ।

বাংলা ছড়াসাহিত্যের ধারায় খালেদ হোসাইনের অবদান বিশেষভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি এমন এক সময়ে লিখছেন, যখন প্রযুক্তির ঝলকানিতে শিশুরা বই থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই সময়ে তাঁর ছড়া শিশুদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে, শব্দের আনন্দে ফিরিয়ে আনে। তাঁর সৃষ্টিতে রয়েছে এমন এক প্রাণশক্তি, যা নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যপ্রেমী করে তুলতে সক্ষম।

সবশেষে বলা যায়, খালেদ হোসাইনের ছড়া বাংলা শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল সম্পদ। তাঁর ছড়ায় যেমন আছে সুর, তেমনি আছে বোধ; যেমন আছে আনন্দ, তেমনি আছে শিক্ষার দীপ্তি। তিনি শব্দের কারিগর, যিনি ছন্দের বুননে নির্মাণ করেন স্বপ্নময় এক জগৎ। বাংলা ছড়াসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে সেইসব স্রষ্টার পাশে, যাঁরা শিশুমনকে আলোকিত করতে কলমকে করেছেন ভালোবাসার প্রদীপ।