আমি রঙের ভাষায় পৃথিবীকে পড়ি: নাহিদ নিয়াজী মান্না
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:০৯ পিএম, ১ মে ২০২৬ শুক্রবার
এ সময়ের জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী নাহিদ নিয়াজী মান্না।
বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলার অঙ্গনে নাহিদ নিয়াজী মান্না একটি উজ্জ্বল নাম। নিপু নামেই তিনি বন্ধু মহলে বেশি পরিচিত। রঙ, রেখা ও বোধের অভিনব সংমিশ্রণে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব এক শিল্পভাষা। দেশ-বিদেশের নানা প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্ম দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। পেয়েছেন এশিয়ান অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল আর্ট অ্যাওয়ার্ড, ইয়াং আর্টিস্ট অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিএফএ ও এমএফএ সম্পন্ন করা এই শিল্পী শিল্পচর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেও চলেছেন। শিল্প, জীবন, সৃজন ও স্বপ্ন নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উইমেননিউজ২৪.কম-এর পক্ষে জোসেফ সরকার
প্রশ্ন : চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্নটা কখন থেকে?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : খুব ছোটবেলা থেকেই। অন্য বাচ্চারা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, আমি তখন দেয়ালে, খাতার পৃষ্ঠায় কিংবা পুরোনো কাগজে আঁকিবুকি করতাম। আমার কাছে আঁকা কখনও নিছক শখ ছিল না; বরং এটা ছিল নিজেকে প্রকাশের এক সহজাত মাধ্যম। তখন হয়তো বুঝতাম না, কিন্তু এখন মনে হয়—শিল্পী হওয়ার বীজটা শৈশবেই রোপিত হয়েছিল।
প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : চারুকলা আমার জন্য শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল আমার শিল্প-আত্মপরিচয়ের জন্মস্থান। সেখানে গিয়ে আমি শিখেছি—শিল্প কেবল রঙতুলির কারিগরি নয়; এটি ভাবনার শৃঙ্খলা, দর্শনের অনুশীলন, পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখার শিক্ষা। বিএফএ ও এমএফএ-র সময়টায় আমি অসাধারণ কিছু শিক্ষক পেয়েছি, যাঁরা আমাকে নিজের ভাষা খুঁজে নিতে সাহায্য করেছেন।

প্রশ্ন : আপনার শিল্পকর্মের প্রধান অনুপ্রেরণা কী?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : আমার অনুপ্রেরণা আসে জীবন থেকে। শহরের ব্যস্ততা, গ্রামের নিসর্গ, মানুষের মুখ, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, আনন্দ, রাজনৈতিক বাস্তবতা—সবই আমাকে ভাবায়। আমি বিশ্বাস করি, শিল্প কখনও শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। জীবনের দেখা-শোনা, অনুভব, প্রশ্ন আর অস্থিরতার মধ্য দিয়েই শিল্পের জন্ম হয়।
প্রশ্ন : আপনার ছবিতে প্রায়ই বিমূর্ততার সঙ্গে বাস্তবতার মিশেল দেখা যায়। এর পেছনের ভাবনা কী?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : বাস্তবতা সবসময় সরলরৈখিক নয়। আমরা যা দেখি, তার পেছনেও থাকে অসংখ্য অদৃশ্য স্তর। আমি সেই অদৃশ্য স্তরগুলো ধরতে চাই। তাই আমার কাজে বাস্তবের আকার থাকে, কিন্তু তার ভেতর বিমূর্ত অনুভবের প্রবাহও কাজ করে। আমি চাই দর্শক ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরি করুক।
প্রশ্ন : দেশে-বিদেশে আপনার বহু প্রদর্শনী হয়েছে। প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : খুব আবেগঘন। যখন প্রথমবার বিদেশের গ্যালারিতে নিজের কাজ ঝুলতে দেখলাম, মনে হয়েছিল—বাংলাদেশের মাটি, আমার অভিজ্ঞতা, আমার ভাষা পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও পৌঁছে গেছে। শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি ভাষা ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করতে পারে।
প্রশ্ন : আপনি নানা রকম পুরস্কার পেয়েছেন। এশিয়ান, ন্যাশনাল ও ইয়াং আর্টিস্ট পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি কেমন?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : অবশ্যই আনন্দের। তবে আমি পুরস্কারকে গন্তব্য মনে করি না। এগুলো দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। প্রতিটি স্বীকৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়—আরও গভীরভাবে কাজ করতে হবে, আরও নতুন কিছু বলতে হবে।

প্রশ্ন : একজন শিল্পীর কাছে পুরস্কার বড়, নাকি দর্শকের অনুভব?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : নিঃসন্দেহে দর্শকের অনুভব। পুরস্কার একটি সময়ের স্বীকৃতি, কিন্তু কোনো দর্শক যদি আমার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হন, ভাবেন, প্রশ্ন করেন—সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।
প্রশ্ন : আপনার সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াটা কেমন?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : আমি হঠাৎ করে ক্যানভাসে বসি না। অনেক দিন ধরে ভাবি, নোট করি, স্কেচ করি। কখনও একটি শব্দ, কখনও একটি মুখ, কখনও কোনো দৃশ্য আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তারপর একসময় সেটা রঙের ভাষা খুঁজে পায়। কাজের সময় আমি খুব নিঃসঙ্গ থাকতে পছন্দ করি।
প্রশ্ন : রঙ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনার বিশেষ কোনো দর্শন আছে?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : রঙ আমার কাছে আবেগের ভাষা। লাল কখনও শুধু উত্তাপ নয়, কখনও প্রতিবাদ। নীল কখনও শান্তি, কখনও নিঃসঙ্গতা। আমি রঙকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করি, তবে কখনও তাকে বদ্ধ অর্থে আটকে রাখি না।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : আমি খুব আশাবাদী। আমাদের তরুণ শিল্পীরা দারুণ কাজ করছেন। তারা বিশ্বশিল্পের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন, আবার নিজেদের শেকড়ের সঙ্গেও যুক্ত। তবে আমাদের আরও বেশি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম দরকার।
প্রশ্ন : নতুন শিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : অনুকরণ নয়, নিজের ভাষা খুঁজে বের করো। অনেক পড়ো, অনেক দেখো, অনেক ভাবো। শুধু আঁকলেই শিল্পী হওয়া যায় না; একজন শিল্পীকে ভালো পর্যবেক্ষক ও চিন্তাশীল মানুষও হতে হয়।

প্রশ্ন : শিল্পচর্চায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : নিজের সঙ্গে সৎ থাকা। বাইরের চাপ, বাজারের চাহিদা, জনপ্রিয়তার মোহ—এসবের মধ্যে নিজের শিল্পসত্য ধরে রাখা খুব কঠিন। কিন্তু শিল্পীকে সেই কঠিন পথটাই বেছে নিতে হয়।
প্রশ্ন : আপনার কাছে শিল্পের সংজ্ঞা কী?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : শিল্প হলো নীরবতার ভাষা। যা কথায় বলা যায় না, শিল্প তা বলে। এটি একই সঙ্গে প্রতিবাদ, প্রেম, স্মৃতি, প্রশ্ন এবং মুক্তির জায়গা।
প্রশ্ন : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : আমি দক্ষিণ এশিয়ার লোকজ স্মৃতি ও আধুনিক নগরজীবনের দ্বন্দ্ব নিয়ে একটি বড় সিরিজে কাজ করছি। পাশাপাশি তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি স্বাধীন আর্ট রেসিডেন্সি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আছে।
প্রশ্ন : ব্যক্তিজীবনে নাহিদ নিয়াজী মান্না কেমন?
নাহিদ নিয়াজী মান্না : খুব সাধারণ। আমি নীরবতা ভালোবাসি, বই পড়তে ভালোবাসি, ভ্রমণ করতে ভালোবাসি। মানুষের গল্প শুনতে ভালো লাগে। হয়তো সেখান থেকেই নতুন ছবির জন্ম হয়।
প্রশ্ন : সবশেষে, শিল্পপ্রেমীদের জন্য কিছু বলুন।
নাহিদ নিয়াজী মান্না : শিল্পকে শুধু দেখবেন না, অনুভব করুন। একটি ছবির সামনে একটু থামুন। হয়তো সেখানে আপনি নিজেরই কোনো অজানা অনুভূতির মুখোমুখি হবেন।
